গ্রাফিক : সময়ের আলো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য স্বস্তির খবর। কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে উত্তরণ হলে রফতানি, শিল্প, ওষুধ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ বাড়ত। অনেক বাণিজ্যসুবিধাও হারাতে হতো। তবে এই বাড়তি সময় কোনোভাবেই নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ নয়। বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে এই উত্তরণ ঘটবে। এর ফলে আরও তিন বছর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা পাওয়া যাবে। কৃষি ও শিল্পে ভর্তুকি এবং নগদ সহায়তা দেওয়ার সুযোগও থাকবে। ওষুধ শিল্পের জন্যও সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি থেকে বের হলে মেধাস্বত্বের নিয়ম আরও কঠোর হবে। এতে ওষুধ উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। তাই এই বাড়তি সময় দেশের শিল্প ও রফতানি খাতকে প্রস্তুত করার সুযোগ দেবে। তবে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি বড় সতর্কবার্তাও রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিনিধি বাংলাদেশের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। ২০২৭ সালের শেষে দেশের প্রস্তুতির অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। এর মানে হচ্ছে, শুধু সময় পেলেই হবে না, এই সময়ে কতটা কাজ হয়েছে, সেটিও দেখাতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হলো তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। মোট রফতানির বড় অংশ আসে এই একটি খাত থেকে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা কমে গেলে পোশাক রফতানিতে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই চামড়া, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য পণ্যের রফতানি বাড়াতে হবে। নতুন বাজার খুঁজতে হবে। ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শুধু রফতানি বাড়ালেই চলবে না। অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাও দূর করতে হবে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বন্দরের কাজের গতি বাড়াতে হবে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার খরচ কমাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রাজস্ব খাতেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশের কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি করব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।
এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ আগে থেকেই প্রস্তুতির সময় পেয়েছিল। করোনা মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেই প্রস্তুতি কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোয়নি। এখন নতুন করে তিন বছর সময় পাওয়া গেছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হলে সরকার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সংস্কারের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; বেসরকারি খাতকেও বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে এগিয়ে আসতে হবে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। বরং এটি অর্থনীতির জন্য নতুন এক পরীক্ষার শুরু। আন্তর্জাতিক সুবিধার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোই হবে প্রকৃত সাফল্য। তাই বাড়তি তিন বছরকে সময়ক্ষেপণের সুযোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। এখনই সংস্কার শুরু করতে হবে। ব্যাংক, বন্দর, রাজস্ব ও বাণিজ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। ২০২৯ সালে বাংলাদেশ যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন অবস্থানে যেতে পারে, সেই প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে