গ্রাফিক : সময়ের আলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। দেশে তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অনিয়মিত বৃষ্টির প্রভাব বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগের ঝুঁকি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাত এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বছরে যে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭০ কোটি ডলার।
দেশে তাপপ্রবাহের প্রভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রচণ্ড গরমে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে। কৃষক, শ্রমিক ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি। গরমের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমছে, আয় কমছে। দেশে তাপজনিত মৃত্যুর সঠিক হিসাব রাখার ব্যবস্থা নেই। জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনাও নেই। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা করা দরকার। কর্মক্ষেত্রে কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের সুরক্ষায় বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর মতো রোগের সম্পর্কও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন মশার বংশবিস্তার এবং রোগের বিস্তারে প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার পর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়তে পারে।
এ তথ্য কাজে লাগানো গেলে আগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব। বর্ষা শুরুর আগেই মশা নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরেও গুরুতর ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দূষিত বায়ু মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে। জলবায়ু ও পরিবেশের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যনীতিকে আরও কার্যকর করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপদ মোকাবিলা করতে হলে টাকা দরকার। সমস্যা হচ্ছে, পর্যাপ্ত টাকা নেই। কাজেই বরাদ্দ কম। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের জন্য নির্ধারিত অর্থের তুলনায় প্রকৃত ব্যয় অনেক কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত ছিল।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাতেও স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগ খুবই সীমিত। অথচ জলবায়ুর অভিঘাত বাড়লে চিকিৎসার প্রয়োজনও বাড়বে। রোগ প্রতিরোধ, আগাম সতর্কতা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতিতে এখন বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতের ক্ষতি কমানো সম্ভব। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কোন এলাকায় কী কাজ হচ্ছে, কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং তাতে মানুষের কী উপকার হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোই বহুলাংশে দায়ী। কিন্তু এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশকে। কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য সহায়তা আদায়ে সরকারকে সক্রিয় হতে হবে।
পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে। এ জন্য পরিবেশ, স্বাস্থ্য, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই জলবায়ু মোকাবিলার পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি