ছবি : সংগৃহীত একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝার জন্য তার অট্টালিকার উচ্চতা, সড়কের প্রশস্ততা কিংবা যানবাহনের আধুনিকতা দেখাই যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হয়, সেই সমাজের মানুষ গণপরিসরে একে অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। বাসে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ তাকে আসন ছেড়ে দেন কি না, নারী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীর প্রতি অন্যরা কতটা সংবেদনশীল, চালক ও সহকারীরা যাত্রীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেন কি না, কিংবা যাত্রীরা নিজের সুবিধার জন্য অন্যের অসুবিধা তৈরি করছেন কি না—এসব ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই একটি জাতির সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে।
যাত্রী পরিবহন কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নয়; এটি প্রতিদিনের সামাজিক সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই বাসে, ট্রেনে কিংবা লঞ্চে নানা শ্রেণি-পেশা, বয়স, ধর্ম, লিঙ্গ ও আর্থসামাজিক অবস্থানের মানুষ একসঙ্গে চলাচল করেন। এই চলাচলের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিয়ম মানার প্রবণতা এবং মানবিকতার যে চর্চা হওয়ার কথা, তার ঘাটতি দেখা দিলে পরিবহনব্যবস্থা কেবল বিশৃঙ্খলই হয় না, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের দুর্বলতাও প্রকাশ পায়।
আমাদের দেশে গণপরিবহনে শুদ্ধাচারের প্রশ্নটি তাই নিছক ভদ্রতা কিংবা ব্যক্তিগত সৌজন্যের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
শুদ্ধাচার বলতে আমরা সাধারণত সততা, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার চর্চাকে বুঝি। পরিবহন খাতে এর অর্থ হলো—যাত্রীকে নির্ধারিত ভাড়ায় সেবা দেওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করা, নিরাপদে গাড়ি চালানো, নির্ধারিত স্থানে ওঠানামার সুযোগ দেওয়া, নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাত্রীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও টিকিট বা ভাড়া পরিশোধ, সারি মেনে চলা, আসন নিয়ে বিবাদ এড়িয়ে চলা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অন্যের অসুবিধার প্রতি সংবেদনশীল থাকা জরুরি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের গণপরিবহনে প্রায়ই এসব ন্যূনতম আচরণের ব্যত্যয় ঘটে। কোথাও যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতায় চালকের বেপরোয়া গতি, কোথাও ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা, কোথাও অসহায় যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, আবার কোথাও বাসের ভেতর অন্যের অধিকার উপেক্ষা করে নিজের সুবিধা আদায়ের প্রবণতা দেখা যায়। যানজটের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি থামানো কিংবা চলন্ত গাড়িতে ওঠানামার ঝুঁকিও আমাদের পরিবহনসংস্কৃতির পরিচিত দৃশ্য।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এসবকে কেবল পরিবহন খাতের সমস্যা বলে পাশ কাটিয়ে যাব? নাকি স্বীকার করব, এর সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতারও সম্পর্ক রয়েছে?
একজন চালক যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান, তখন সেখানে শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কাজ করে না; কাজ করে সময়মতো ট্রিপ শেষ করার চাপ, আয় বাড়ানোর তাগিদ, নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং নিরাপত্তার প্রতি অবহেলাও। একজন পরিবহনকর্মী যখন যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত অসৌজন্যের পাশাপাশি শ্রমপরিবেশ, প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আবার একজন যাত্রী যখন অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করেন, তখন প্রকাশ পায় সামাজিক দায়িত্ববোধের সংকট।
অর্থাৎ, শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব এককভাবে চালক, শ্রমিক, মালিক কিংবা যাত্রীর নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, আইনের প্রয়োগ এবং নাগরিক শিক্ষার প্রশ্নও।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যাত্রী কোনো করুণার পাত্র নন; তিনি সেবাগ্রহীতা। তার অর্থের বিনিময়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, পরিবহনকর্মীরাও মানুষ। তাঁদের ন্যায্য মজুরি, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কর্মীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে কেবল তাঁদের কাছ থেকে শুদ্ধাচার প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার অজুহাতে যাত্রীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
একটি সুস্থ পরিবহনসংস্কৃতিতে এই দুই পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব পরস্পরের পরিপূরক হবে। মালিক ন্যায্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবেন, চালক নিরাপদে গাড়ি চালাবেন, সহকারী যাত্রীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করবেন, যাত্রী নিয়ম মেনে চলবেন এবং রাষ্ট্র আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এভাবেই দায়িত্বের একটি সম্মিলিত কাঠামো তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারের গুরুত্ব আরও বেশি। ভিড়ের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা, একজন প্রবীণ মানুষকে ওঠানামায় অসহায় অবস্থায় পড়তে দেখা কিংবা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী একজন মানুষের জন্য প্রবেশযোগ্য পরিবহন না থাকা— এসবকে বিচ্ছিন্ন অসুবিধা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো আমাদের পরিবহনব্যবস্থা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, তার পরীক্ষা। যে ব্যবস্থা দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় না, সেই ব্যবস্থার আধুনিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই প্রসঙ্গে ঢাকার মেট্রোরেলে ঘটে যাওয়া এক প্রবীণ শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামাজিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নাজিবুর রহমান (৬৪) মেট্রোরেলে যাত্রাকালে অসুস্থ বোধ করেন। তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আশপাশের যাত্রীদের কাছে বসার জন্য জায়গা চেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। পরে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যান এবং তাঁর মৃত্যু হয়।
একবার ভাবুন, দৃশ্যটি কেমন! একটি আধুনিক মেট্রোরেল ছুটে চলেছে রাজধানীর বুক চিরে। চারপাশে শিক্ষিত, সচেতন, কর্মব্যস্ত মানুষের ভিড়। কেউ হয়তো মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবিকতার পক্ষে পোস্ট লিখছেন, কেউ হয়তো রাষ্ট্র ও সমাজের অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন প্রবীণ মানুষ শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করে শুধু একটু বসার জায়গা চেয়েছিলেন। তাঁর চাওয়াটা ছিল না কোনো বিশেষ সুবিধা, ছিল না কারও কাছে বড় কোনো দাবি— ছিল কেবল বিপন্ন শরীরটাকে সামান্য বিশ্রাম দেওয়ার আকুতি। অথচ তাঁর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সামান্য জায়গাটুকুও তিনি পাননি।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কেউ আসন ছেড়ে না দেওয়ার ঘটনা এবং তার মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। স্ট্রোক একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা। কিন্তু অসুস্থ একজন প্রবীণ মানুষের সাহায্যের আবেদন উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগই আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্ন করার জন্য যথেষ্ট। একটি আসন হয়তো মৃত্যু ঠেকাতে পারত কি না, তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না; কিন্তু একজন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ যে ছিল, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য হাজির করে: আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, কিন্তু আধুনিক মন তৈরি করা অনেক কঠিন। আমরা মেট্রোরেল নির্মাণ করতে পারি, উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করতে পারি, দ্রুতগতির ট্রেনে চড়ে কয়েক মিনিটে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যেতে পারি; কিন্তু পাশের মানুষটির অসহায়ত্ব অনুভব করতে না পারলে আমাদের এই অগ্রগতির মানবিক তাৎপর্য কোথায়?
যে মানুষটি আসন ছেড়ে দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে, তার পরিচয় আমরা জানি না। তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিহ্নিত করা বা যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। বরং প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য। আমিও কি কখনো নিজের আরামের কাছে অন্যের কষ্টকে তুচ্ছ করেছি? আমিও কি কখনো ভেবেছি, বিপদে পড়া মানুষটিকে সাহায্য করার দায়িত্ব অন্য কেউ পালন করবে? একজন মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার আগে আমরা কেন অপেক্ষা করি—অন্য কেউ আগে এগিয়ে আসুক?
একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় সব সময় বড় কোনো অপরাধের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় একটি আসন আঁকড়ে ধরে থাকার মধ্যে, একজন অসুস্থ মানুষের আকুতি না শোনার মধ্যে, বিপন্ন কাউকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে। মানুষ যখন নিজের সামান্য স্বাচ্ছন্দ্যকে অন্যের জরুরি প্রয়োজনের চেয়ে বড় করে দেখে, তখন সভ্যতার বাহ্যিক সাজসজ্জার আড়ালে মানবিক শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণ মানুষটি কারও বাবা, কারও শিক্ষক, কারও সহকর্মী, কারও জীবনের আশ্রয়। আজ তিনি অসহায়, কাল আমিও হতে পারি। আজ যে তরুণটি আসনে বসে আছেন, একদিন তারও বয়স হবে; তাঁর শরীরও ক্লান্ত হবে, চলার শক্তি কমবে, হয়তো অপরিচিত কারও কাছে একটু সহযোগিতা চাইতে হবে। তখন তিনি কী ধরনের সমাজ প্রত্যাশা করবেন— এমন একটি সমাজ, যেখানে সবাই নিজের সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে অপরিচিত মানুষও বিপদের মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে দেয়?
মেট্রোরেলের এই ঘটনা তাই কেবল একজন প্রবীণ শিক্ষকের মৃত্যুর সংবাদ নয়; এটি আমাদের নাগরিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সামনে রাখা একটি কঠিন প্রশ্নপত্র। এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় নয়, স্লোগানে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবিকতার প্রচারণায়ও নয়—উত্তর দিতে হবে বাস্তব আচরণে।
একটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়তো ছোট কাজ, কিন্তু সেই কাজের মধ্যে যে মানবিকতা থাকে, তার মূল্য কোনো আধুনিক স্থাপনার চাকচিক্য দিয়ে মাপা যায় না। আর যে সমাজ একজন অসুস্থ প্রবীণ মানুষের অসহায় আবেদন শুনেও নড়েচড়ে বসতে শেখেনি, সেই সমাজকে নিজের সভ্যতা নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার আগে অন্তত একবার আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত।
শুদ্ধাচার চর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা। আইন কেবল জরিমানা কিংবা শাস্তির ভয়ে মানার বিষয় নয়; আইন মানার পেছনে থাকা জনস্বার্থ উপলব্ধি করাও জরুরি। লালবাতি অমান্য করা, যত্রতত্র গাড়ি থামানো, ফুটপাত দখল করা, যাত্রী ওঠানোর জন্য প্রতিযোগিতা কিংবা বাসের ভেতর উচ্চস্বরে অন্যকে বিরক্ত করা—এসব আচরণকে আমরা যত দিন স্বাভাবিক বলে মেনে নেব, তত দিন সুশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।
তবে নাগরিকের নৈতিকতার কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায় আড়াল করা যাবে না। নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়ম ভাঙলে পার পেয়ে যান, আর সাধারণ মানুষকে শাস্তি পেতে হয়—এমন অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে আইন সম্পর্কে শ্রদ্ধার বদলে অবিশ্বাস তৈরি করে। তাই পরিবহন খাতে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান জবাবদিহি।
একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে নাগরিক আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণপরিবহনে সারি মেনে ওঠা, প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীকে সহযোগিতা করা, আসন নিয়ে বিবাদ এড়িয়ে চলা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানো—এসব অভ্যাসকে সামাজিক মূল্যবোধের অংশ করে তুলতে হবে। পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোও চালক ও সহকারীদের জন্য আচরণবিধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যাত্রীসেবার মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শুদ্ধাচারকে প্রচারপত্রের শব্দ কিংবা আনুষ্ঠানিক সভার আলোচ্য বিষয় করে রাখলে চলবে না। একে প্রতিদিনের আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাসের দরজায়, টিকিট কাউন্টারে, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, লঞ্চের ডেকে কিংবা সড়কের মোড়ে—যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়, সেখানেই শুদ্ধাচারের পরীক্ষা।
সভ্যতার মাপকাঠি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। যে দেশে উন্নত যানবাহন আছে, কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তাহীন; যে শহরে উড়ালসড়ক আছে, কিন্তু পথচারীকে অবহেলা করা হয়; যে পরিবহনে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু মানুষের প্রতি ন্যূনতম সম্মান নেই— সেখানে উন্নয়নের দৃশ্যমান অর্জন থাকলেও মানবিক অগ্রগতির প্রশ্ন থেকে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি, মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি স্বার্থপর, সমাজে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটছে। অথচ এই অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাই করার জন্য দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের বাসযাত্রা, রেলভ্রমণ কিংবা লঞ্চযাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, আমরা অন্যের অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দিই এবং নিজের সুবিধার সীমা কোথায় টানতে জানি।
গণপরিবহন তাই আমাদের সভ্যতার একটি চলমান আয়না। এই আয়নায় আমরা যেমন আমাদের অসংগতি দেখি, তেমনি পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখতে পাই। একজন চালক যখন যাত্রীর নিরাপত্তাকে নিজের তাড়াহুড়োর ঊর্ধ্বে স্থান দেন, একজন যাত্রী যখন প্রবীণ মানুষকে আসন ছেড়ে দেন, একজন পরিবহনকর্মী যখন অসহায় যাত্রীর সঙ্গে সহমর্মিতার আচরণ করেন, কিংবা একজন নাগরিক যখন অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেতন থাকেন— তখনই সভ্যতার চর্চা বাস্তব হয়ে ওঠে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং অন্যের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে গন্তব্যে পৌঁছানো। কারণ পরিবহনের সাফল্য কেবল কত মানুষকে কত দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হলো, তার হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। এর সাফল্য নির্ভর করে কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো, কতটা বৈষম্য কমল এবং কতটা মানবিক আচরণ প্রতিষ্ঠিত হলো, তার ওপরও।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ: আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই? এমন এক সমাজে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ঠেলে সরিয়ে দেয়? নাকি এমন এক সমাজে, যেখানে অপরিচিত মানুষের প্রতিও দায়িত্ববোধ কাজ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রতিদিনের আচরণেই লেখা হচ্ছে। একটি বাসের ভেতর, একটি টিকিট কাউন্টারে, একটি রেলস্টেশনে, একটি ব্যস্ত সড়কের মোড়ে।
সভ্যতা শুধু বড় বড় স্থাপনায় নির্মিত হয় না; সভ্যতা নির্মিত হয় মানুষের আচরণে। আর যাত্রী পরিবহনে শুদ্ধাচারের চর্চা সেই সভ্যতাকে প্রতিদিন যাচাই করার এক অনিবার্য মাপকাঠি।
সময়ের আলো/টিকে