সোশ্যাল মিডিয়ার আয় : তরুণ প্রজন্ম কি বিপথগামী হচ্ছে? একসময় সমাজে মানুষের পরিচয় ও মর্যাদা নির্ধারিত হতো শিক্ষা, মেধা, শ্রম, সৃজনশীলতা এবং অর্জনের ভিত্তিতে। একজন মানুষ কতটা জ্ঞানী, কতটা দক্ষ এবং সমাজের জন্য কতটা অবদান রাখতে পেরেছেন, তা ছিল তার মর্যাদা নির্ধারণের অন্যতম মাপকাঠি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এখানে জনপ্রিয়তা অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি করছে, ব্যক্তিগত জীবন পরিণত হচ্ছে প্রদর্শনীর উপকরণে, আর মানুষের মনোযোগ হয়ে উঠছে বাজারের মূল্যবান সম্পদ। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আয় করতে গিয়ে তরুণ প্রজন্ম কি বিপথগামী হচ্ছে?
প্রশ্নটির উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে তরুণদের জন্য আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে জনপ্রিয়তার মোহে নৈতিকতা, রুচি ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে আপস করার প্রবণতাও সৃষ্টি করেছে। মূল সমস্যা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আয় করার মধ্যে নয়; বরং সেই আয় অর্জনের জন্য কোন পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে এবং সমাজ কোন ধরনের আচরণকে সাফল্য হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তার মধ্যেই সমস্যার মূল নিহিত।
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে বর্তমানে একজন তরুণ ঘরে বসেই ভিডিও নির্মাণ, লেখালেখি, গ্রাফিক ডিজাইন, অনলাইন শিক্ষা, বিপণন কিংবা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। প্রচলিত কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। যাদের প্রতিভা ও দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। অনেক তরুণ নিজেদের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছেন। এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা মানে সময়ের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা।
তবে এই ইতিবাচক সম্ভাবনার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে জনপ্রিয়তাকেন্দ্রিক এক অদ্ভুত অর্থনীতি। এখানে অনেক সময় জ্ঞানের চেয়ে চমক, সৃজনশীলতার চেয়ে বিতর্ক এবং ব্যক্তিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনের প্রদর্শনী বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। কে কতটা অর্থবহ কাজ করছেন, তার চেয়ে কে কতবার আলোচনায় আসছেন, কার ভিডিও কতবার দেখা হচ্ছে কিংবা কার অনুসারীর সংখ্যা কত— এসবই সাফল্য পরিমাপের দৃশ্যমান সূচক হয়ে উঠছে। ফলে কিছু তরুণের কাছে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিখ্যাত হওয়া। অথচ কীসের জন্য বিখ্যাত হচ্ছেন, সেই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে।
এখান থেকেই সংকটের সূচনা। একজন তরুণ যখন দেখেন, বছরের পর বছর পড়াশোনা ও পরিশ্রম করেও একজন শিক্ষক, গবেষক কিংবা দক্ষ পেশাজীবী যে সামাজিক স্বীকৃতি পান না, একটি চটকদার ভিডিও তৈরি করে অন্য কেউ তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিতি ও অর্থ অর্জন করছেন, তখন তার মধ্যে দ্রুত সাফল্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি হয়তো ভাবতে শুরু করেন, দক্ষতা অর্জনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার চেয়ে ভাইরাল হওয়ার কৌশল শেখাই বেশি লাভজনক। এই মানসিকতা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা, শ্রম ও জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
অবশ্য জনপ্রিয় সব কনটেন্ট নির্মাতাকে একইভাবে বিচার করার সুযোগ নেই। বিনোদন মানুষের জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ, আর হাস্যরসও সৃজনশীলতারই অংশ। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন বিনোদনের নামে অশালীনতা, অপমান, মিথ্যাচার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কিংবা বিপজ্জনক আচরণকে অর্থ উপার্জনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের পরিবার, সম্পর্ক, এমনকি নিজের মর্যাদাকেও প্রদর্শনীর উপকরণে পরিণত করেন। অন্যের দুর্দশা নিয়ে ঠাট্টা করা, অপরিচিত মানুষকে বিব্রত করা কিংবা সামাজিক সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করে ভিডিও তৈরি করার প্রবণতাও এই প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রবণতার জন্য শুধু তরুণদের দায়ী করলে সমস্যাটির প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করা যাবে না। যে সমাজে বেকারত্ব বাড়ে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ সীমিত থাকে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, সেখানে দ্রুত আয়ের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হয়। একজন তরুণ যখন দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কর্মসংস্থান পান না, তখন অনলাইনে আয়ের সম্ভাবনা তাকে আকৃষ্ট করতেই পারে। সেই আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কোনো প্ল্যাটফর্ম বা ব্যবসায়িক ব্যবস্থা যদি তার মনোযোগকে পণ্যে পরিণত করে, তাহলে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আর শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আরও বিস্তৃত পরিসরে বিবেচনার দাবি রাখে।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের মনোযোগ ধরে রাখা ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম শর্ত। ফলে যে কনটেন্ট মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে পারে, তা নির্মাতার জন্য জনপ্রিয়তা ও আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদিও সব প্ল্যাটফর্ম কিংবা সব ধরনের কনটেন্টের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর নয়, তবু মনোযোগ ধরে রাখার এই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো উত্তেজনা, সংঘাত ও চমকনির্ভর কনটেন্টকে উৎসাহিত করে। এর ফলে দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাতারাও চাপের মুখে পড়তে পারেন। তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আরও বেশি দর্শক পেতে হলে কি আগের চেয়ে আরও বেশি চমকপ্রদ কিছু তৈরি করতে হবে?
এই চাপের আরেকটি পরিণতি হলো আত্মপরিচয়ের সংকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো জীবন দেখে অনেক তরুণ নিজেদের বাস্তব জীবনকে ব্যর্থ বলে মনে করতে পারেন। বিলাসবহুল গাড়ি, দামি পোশাক, বিদেশভ্রমণ কিংবা বিপুল আয়ের প্রদর্শনী তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে সাফল্য মানেই সম্পদ প্রদর্শন। অথচ অনলাইনে উপস্থাপিত জীবন সব সময় বাস্তব জীবনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে থাকে পরিকল্পিত উপস্থাপনা, বিজ্ঞাপন কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ। এই পার্থক্য বুঝতে না পারলে তরুণেরা অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা, হতাশা এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের ঝুঁকিপূর্ণ পথে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমানে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় ডিজিটাল অর্থনীতিকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই; বরং এর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, তরুণেরা যেন প্রতারণামূলক আয়ের প্রলোভন, ভুয়া কোর্স, অবাস্তব সাফল্যের গল্প কিংবা জনপ্রিয়তার নামে অপমানজনক কর্মকাণ্ডের ফাদে না পড়েন। এ জন্য অনলাইন আয়ের প্রকৃত পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু বিচার করার সক্ষমতা এবং আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং তরুণদের শেখাতে হবে, কীভাবে প্রযুক্তিকে দক্ষতা অর্জন, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার কাজে ব্যবহার করা যায়। তাদের বুঝতে হবে, জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা এক বিষয় নয়; একইভাবে আয় ও সাফল্যও সব সময় সমার্থক নয়। একজন মানুষ কতজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কী সৃষ্টি করেছেন, কী শিখেছেন এবং অন্য মানুষের জীবনে কী অবদান রেখেছেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। অনলাইন প্রতারণা, হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ ডিজিটাল পেশায় যুক্ত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির সুযোগ সীমিত করা নয়, বরং এর অপব্যবহার কমিয়ে ইতিবাচক ব্যবহারকে উৎসাহিত করা।
সবশেষে আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: আমরা তরুণদের সামনে সাফল্যের কোন আদর্শ তুলে ধরছি? এমন এক সাফল্য, যেখানে মানুষকে প্রতিভা বিকশিত করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়, জ্ঞান অর্জন করতে হয় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়? নাকি এমন এক সাফল্য, যেখানে যেকোনো উপায়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেই অর্থ ও পরিচিতি অর্জন সম্ভব?
সোশ্যাল মিডিয়া তরুণ প্রজন্মকে অবধারিতভাবে বিপথগামী করছে— এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবতার একটি সরলীকৃত ব্যাখ্যা হবে। এই মাধ্যম যেমন সৃজনশীলতা ও আত্মনির্ভরতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে, তেমনি জনপ্রিয়তার অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা কিছু তরুণকে ভুল পথে পরিচালিত করার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। তাই প্রযুক্তিকে এককভাবে দোষারোপ করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে সৎ উপার্জন মর্যাদা পাবে, জ্ঞান ও দক্ষতা যথাযথ স্বীকৃতি পাবে এবং অর্থের চেয়ে মানুষের মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কারণ, একটি প্রজন্মের বিপথগামিতা শুধু তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়; কখনো কখনো তা সমাজের ভুল পুরস্কারব্যবস্থারও পরিচায়ক। আমরা যদি চাই তরুণেরা শুধু ভাইরাল নয়, যোগ্যও হয়ে উঠুক, তাহলে তাদের সামনে এমন উদাহরণ ও সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে প্রতিভা, প্রদর্শনীর চেয়ে সৃষ্টি এবং ক্ষণস্থায়ী আয়ের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অর্জন বেশি মূল্যবান বলে বিবেচিত হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ