আস্থার পুনর্গঠন ও বিশ্বজনীন সংকটে জাতিসংঘ

ড. মতিউর রহমান

মতামত

২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮১তম বার্ষিকী উদযাপন করছে এমন এক বিশ্বে, যেখানে যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং

2026-10-24T02:59:29+00:00
2026-10-24T02:59:29+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
জাতিসংঘ দিবস
আস্থার পুনর্গঠন ও বিশ্বজনীন সংকটে জাতিসংঘ
ড. মতিউর রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮১তম বার্ষিকী উদযাপন করছে এমন এক বিশ্বে, যেখানে যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে ক্রমাগত অনিশ্চিত করে তুলছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রূপান্তর মোকাবিলা : সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ (রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন : অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল)— বর্তমান সময়ের একটি মৌলিক সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। সেই সংকট শুধু সম্পদ বা প্রযুক্তির অভাব নয়; বরং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ক্রমাবনতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিশ্বনেতাদের বুঝিয়েছিল, জাতীয়তাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক শক্তির আস্ফালন এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতা সম্মিলিতভাবে মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করা। ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্যগুলোর প্রাসঙ্গিকতা অটুট, যদিও সেগুলো বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

জাতিসংঘের মূল্যায়নে সাফল্য ও ব্যর্থতা— দুই দিকই বিবেচনা করা জরুরি। সংস্থাটি সব যুদ্ধ থামাতে পারেনি, গণহত্যা প্রতিরোধে সর্বত্র সফল হয়নি কিংবা দারিদ্র্য ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারেনি। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থসংঘাত এবং ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার বহু ক্ষেত্রে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সামগ্রিক ভূমিকা শুধু নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা দিয়ে বিচার করা যায় না। টিকাদান, খাদ্য সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে এর বিভিন্ন সংস্থা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। 

সমস্যা হলো, জাতিসংঘের সর্বজনীন আদর্শের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার অসম বণ্টনের একটি গভীর বৈপরীত্য রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের হাতে ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে গড়ে ওঠা এই কাঠামো বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক শক্তি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে ধারণ করে না। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের আবাস আফ্রিকা মহাদেশের কোনো স্থায়ী আসন নেই। অন্যদিকে, ভারত, জাপান, জার্মানি এবং লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।

যখন কোনো স্থায়ী সদস্য নিজের স্বার্থ কিংবা মিত্ররাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ আটকে দেয়, তখন আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে জাতিসংঘ যদি কেবল বিবৃতি প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তবে এর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক আইন তখনই কার্যকর থাকে, যখন তা শক্তিশালী ও দুর্বল— সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

এ কারণে জাতিসংঘের সংস্কার এখন আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্ব পুনর্বিন্যাস, ভেটো ক্ষমতার দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে কার্যকর সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। সংস্কার কঠিন হতে পারে, কিন্তু কঠিন বলেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

আস্থা পুনর্গঠনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জলবায়ু পরিবর্তন। তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইতিমধ্যে বহু দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থায়ন ও নির্গমন হ্রাসের অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তরের অর্থায়ন সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য করা জরুরি। 

জলবায়ু সংকটের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দেশগুলোকে এর সর্বাধিক মূল্য দিতে বাধ্য করা বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রযুক্তিগত রূপান্তরও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতায় বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে অপতথ্য, বৈষম্য, নজরদারি এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা ও জৈবপ্রযুক্তির অপব্যবহার মানবিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ। কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে এসব ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই জাতিসংঘের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির সুফল ন্যায্যভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জাতিসংঘের কার্যকারিতার সঙ্গে অর্থায়নের প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর চাঁদা পরিশোধে বিলম্ব কিংবা মানবিক সহায়তায় ঘাটতি দেখা দিলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো পরিশোধ করতে হবে এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যয় কমানো প্রয়োজন, কিন্তু নির্বিচারে ব্যয় সংকোচন করে মানবিক কার্যক্রম দুর্বল করা সমাধান নয়। সাফল্য পরিমাপ করতে হবে কতজন মানুষের জীবন রক্ষা পেল, কত শিশু প্রয়োজনীয় সেবা পেল এবং কতটি সংঘাত আলোচনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা গেল— তার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। দুর্যোগ প্রস্তুতি, জলবায়ু অভিযোজন, নারীর অংশগ্রহণ এবং দারিদ্র্য মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণও বিশ্বশান্তিতে দেশটির অবদান তুলে ধরে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের কূটনীতিক খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বমূলক অর্জন। এই অবস্থানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপান্তর করা জরুরি।

রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সংহতির সীমাবদ্ধতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, স্থানীয় জনসেবা ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকারকে উপেক্ষা করে কোনো সমাধান টেকসই হতে পারে না।

জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সমাজ, গবেষক এবং সংকটের শিকার জনগোষ্ঠীর বক্তব্য আরও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। জাতিসংঘকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি এর সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করাও আত্মঘাতী।

জাতিসংঘ দিবস ২০২৬ তাই আনুষ্ঠানিক উদযাপনের চেয়ে আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের উপলক্ষ হওয়া উচিত। বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিকল্প কোনো নিরাপদ বিচ্ছিন্ন বিশ্ব নয়; বরং এমন একটি বিভক্ত ব্যবস্থা, যেখানে শক্তিই অধিকার নির্ধারণ করবে। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতারা পৃথিবীতে স্বর্গ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেননি; তারা মানবসভ্যতাকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা এবং শান্তি, মর্যাদা ও যৌথ অগ্রগতির পথ সুগম করতে চেয়েছিলেন। ৮১ বছর পর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন। জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ফিরবে তখনই, যখন এর প্রতিশ্রুতি কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কল্যাণে বাস্তব রূপ নেবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   আস্থা  পুনর্গঠন  বিশ্বজনীন  সংকটে জাতিসংঘ  জাতিসংঘ দিবস 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: