দারিদ্র্য কমেছে কিন্তু মান বাড়েনি কর্মসংস্থানের

গোলাম জিলানী

মতামত

দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। বিগত কয়েক দশকের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ, অভিবাসন

2026-10-23T06:13:42+00:00
2026-10-23T06:13:42+00:00
 
  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
দারিদ্র্য কমেছে কিন্তু মান বাড়েনি কর্মসংস্থানের
গোলাম জিলানী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। বিগত কয়েক দশকের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ, অভিবাসন ও রেমিট্যান্স এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। 

দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসা কি টেকসইভাবে হয়েছে, নাকি তাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে? ২০২৫ সালের বিশ্বব্যাংকের পভার্টি অ্যান্ড ইকুইটিবিষয়ক মূল্যায়নে দেখা যায়, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ পুনরায় দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের হয়তো এখনকার আয় দারিদ্র্যসীমার ওপরে, কিন্তু সঞ্চয় কম, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা নেই। অসুস্থতা, চাকরি হারানো, মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতি তাদের আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

দারিদ্র্যসীমা ওপরে যাওয়াই শেষ কথা নয়

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন নির্মাণশ্রমিকের আয় বেড়েছে। তার পরিবারের মোট আয় এখন দারিদ্র্যসীমার ওপরে। তিনি দারিদ্র্য থেকে বের হয়েছেন, পরিসংখ্যান অন্তত তাই বলছে। কিন্তু তার কাজ অনিয়মিত। পরের দিন কাজ পাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ, সঞ্চয়ও নেই। সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বাড়ছে, বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। একটি বড় চিকিৎসা ব্যয় এলে তাকে ধার করতে হবে। কারণ সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের বাইরে তিনি। তিনি কি সত্যিই দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন? তার মতো কোটি শ্রমিকের একই হাল! বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি মানুষ এমন কর্মসংস্থানে যুক্ত, যেখানে আয়, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতির সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত বা নেই বললেই চলে।

দারিদ্র্য কমেছে কিন্তু মান বাড়েনি কর্মসংস্থানের

কর্মসংস্থান দারিদ্র্য কমানোর প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সব কর্মসংস্থান সমানভাবে দারিদ্র্য কমায় না। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও এর ৬৩ শতাংশ এসেছে কৃষিতে, যা অনেকটা নিজস্ব গতিতে এবং তেমন কোনো সহযোগিতা ছাড়াই। একই সময়ে কম উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান থেকে দারিদ্র্য কমানোর হারও দুর্বল হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের সময়ে দারিদ্র্য কমাতে শ্রম আয়ের অবদান ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের সময়ে তা নেমে আসে ৫১ শতাংশে। কম মজুরি, অনিয়মিত আয় ও কম উৎপাদনশীলতার কাজ মানুষকে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সবসময় অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে না। কাজেই টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনে প্রয়োজন টেকসই ও শোভন কর্মসংস্থান।


রয়েছে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ঘাটতি!

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ও দক্ষতার অমিল বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় অর্ধেকই কম বেতনের শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। এখানে একটা মৌলিক পরিবর্তন দরকার। একজন তরুণকে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। তাকে প্রশিক্ষণ থেকে শিক্ষানবিশ, শিক্ষানবিশ থেকে উপযুক্ত চাকরি এবং চাকরি থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ তৈরি করে দিতে হবে। ভেঙে দিতে হবে বেকারত্বের দুষ্টচক্র। তা হলেই টেকসই কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।

নারীর ‘কর্মের সুযোগ’ ও ‘কর্মে টিকে থাকা’ আরও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে নারীরা পোশাক শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গৃহভিত্তিক উৎপাদন ও বিভিন্ন সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ শুধু কাজের সুযোগের ওপর নির্ভর করে না। বাড়ি বা কর্মক্ষেত্রে শিশু যত্নের ব্যবস্থা আছে কি না, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা আছে কি না, কর্মক্ষেত্র কতটা উপযোগী, কাজের সময় কতটা নমনীয় এবং উপার্জন পরিবারে নারীর নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা বাড়াচ্ছে, এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ একজন নারীকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করানো এক বিষয়, তাকে সেখানে টিকিয়ে রেখে আয় ও সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা আরেক বিষয়। কাজেই নারীদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার পাশাপাশি টিকিয়ে রাখারও উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

জলবায়ু পরিবর্তন দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথকে আরও কঠিন করছে

বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও জলবায়ু ঝুঁকি একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চর, হাওড়, উপকূল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার একটি পরিবার দুর্যোগে তার ঘর, গবাদিপশু, ফসল বা ব্যবসার মূলধন হারাতে পারে। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য-সূচকও দারিদ্র্য ও জলবায়ু ঝুঁকির এই আন্তঃসম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ১৪.৯ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে এবং আরও ২৪.৯ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ছিল। তাই একটি পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পাশাপাশি এমন সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে, যাতে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার পর তারা আবার শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য না হয়। অর্থাৎ দারিদ্র্যমুক্তি শুধু দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা নয়, বরং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের বাইরে থাকা।

অর্থনৈতিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে

টেকসইভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে আমাদের পরবর্তী পর্যায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত দরিদ্রের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ানো। একজন দরিদ্র তরুণ যাতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানে যেতে পারেন। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যেন ঋণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে, বাজারে প্রবেশ করতে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। একজন নারী যেন আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সেই আয় ধরে রাখতে, ব্যবহার করতে এবং বাড়াতে পারেন। একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার যেন শুধু দুর্যোগের পর সহায়তা না পায়, তারা যেন এমন জীবিকা পায়, যা ভবিষ্যতের ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে পারে। এখানে অর্থায়নের ভূমিকা আছে, সামাজিক সুরক্ষার ভূমিকা আছে, আছে দক্ষতার ভূমিকাও। কিন্তু সবকিছুকে যুক্ত করতে হবে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও স্থায়ী জীবিকার সঙ্গে। ফলে কর্মসংস্থান স্থিতিশীল এবং টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে।

কখন বলব দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে?

বাংলাদেশ কতটা দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে, তা বোঝার জন্য শুধু একটি সংখ্যাগত পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে কতজন দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছেন এবং তাদের কতজন সেই অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন তার ওপর। পাশাপাশি মানুষের আয় বৃদ্ধি ও আয়ের স্থায়িত্ব, কর্মসংস্থানের সুযোগ, ভালো ও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সক্ষমতা এবং শুধু ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদ ও আয়ের ভিত্তি গড়ে তোলার অগ্রগতিও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব সূচকের সম্মিলিত মূল্যায়নই বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারে।

আমরা স্বপ্ন দেখি, একদিন বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাবে, যেখানে অসুস্থতা, চাকরি  হারানো, বন্যা কিংবা অর্থনৈতিক ধাক্কা একটি পরিবারের বহু বছরের অগ্রগতিকে আবার শূন্যে নামিয়ে দিতে পারে না। কারণ দারিদ্র্য থেকে বের হওয়া একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন হলেও দারিদ্র্যমুক্ত হওয়া একটি টেকসই সক্ষমতা। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের পরবর্তী অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে এই সক্ষমতা কতটা বিস্তৃত করা যায়, তার ওপর।

লেখক : উন্নয়ন বিশ্লেষক ও ব্যবস্থাপক পিকেএসএফ
মতামত লেখকের নিজস্ব 


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   দারিদ্র্য  মান  বাড়েনি  কর্মসংস্থান 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: