গ্রাফিক : সময়ের আলো রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার ঘটনা দেশের মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। গত শনিবারের ওই অভিযানে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায়। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ ঘটনা যে প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা হলো— মাদক কারবারিরা কতটা বেপরোয়া হলে একজন মন্ত্রীকে নিজে অভিযানে নামতে হয়?
মাদকের ভয়াবহতা এখন শুধু মাদকসেবীর স্বাস্থ্য বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জননিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮৪ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকের পেছনে বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। মাদক সংগ্রহের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি বলেছেন, সমাজে সংঘটিত অনেক ঘৃণ্য ও চাঞ্চল্যকর অপরাধের পেছনে মাদক ও জুয়া বড় ভূমিকা রাখে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সময়ের আলোতে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, জুরাইন ও গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। একসময় নির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাদক বিক্রি হলেও এখন পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও এর বিস্তার ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু মাদক কারবারি নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভয়ে অনেকে প্রতিবাদ করতে পারেন না। কোথাও কোথাও মাদকের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক পরিবার এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দীর্ঘদিনের বসতভিটা বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একটি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে বসবাসের অধিকার এভাবেই মাদকের কারণে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর মবের ভয়ে নিয়মিত অভিযানে বিঘ্ন ঘটেছিল। সেই সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। বর্তমানে অভিযান আবার জোরদার করা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেছেন।
বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। অভিযোগ আছে, অভিযানের খবর আগেই মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়। অভিযানে কেউ গ্রেফতার হলেও পরে তারা সহজেই ছাড়া পেয়ে আবার কারবারে ফিরে আসে। এমনটা হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কার্যকরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য এর উৎস, সরবরাহপথ, বিক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে। সীমান্ত দিয়ে যেন মাদক প্রবেশ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। মাদক কারবারে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেফতার, মামলা ও বিচারের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। তাদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে এ কাজে যুক্ত করা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু কমিটি গঠন করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সহজলভ্য করা জরুরি।
মাদকবিরোধী লড়াইয়ে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব পক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে। তবে এ দায়িত্ব পালনের প্রধান কর্তব্য রাষ্ট্রের। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। মাদক মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মাদকের কারণে মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হবে, সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে— এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতা ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সেটা করা সম্ভব হলে সদ্যবিদায়ি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর মতো আর কোনো জনপ্রতিনিধিকে হয়তো ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাদক নির্মূলে অভিযানে নামতে হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি