ফ্যামিলি কার্ড : আস্থা রক্ষার প্রথম পরীক্ষা

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

মতামত

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাস্তবে নামিয়ে আনার চেষ্টা সহজ কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক

2026-10-20T05:59:59+00:00
2026-10-20T05:59:59+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
ফ্যামিলি কার্ড : আস্থা রক্ষার প্রথম পরীক্ষা
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৫৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাস্তবে নামিয়ে আনার চেষ্টা সহজ কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় এটিকে সরকারের সিগনেচার প্রোগ্রাম বলেছেন আর আমার মনে হয় কথাটা অতিরঞ্জন নয়। নারীকে পরিবারের অর্থনৈতিক কেন্দ্রে বসানোর এই ভাবনা শুধু ভাতার হিসাব নয়, সমাজের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা। মাসে আড়াই হাজার, বছরে ৩০ হাজার টাকা। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে অঙ্কটা সামান্য। কিন্তু বরেন্দ্রের কোনো অভাবী ঘরে, চরের কোনো বিধবা মায়ের হাতে, কাজহীন মৌসুমের কোনো দিনমজুর পরিবারে এই টাকা মানে চুলায় আগুন, সন্তানের খাতা, অসুখে ওষুধ।

তাই এই কর্মসূচির সাফল্য যেমন বড়, ব্যর্থতার মূল্যও ততটাই ভারী। আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে-ফিরে আসে। এই কর্মসূচির আসল মূলধন কী? টাকা নয়, আমার মতে আস্থা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে তালিকাটা ন্যায্য, টাকাটা সত্যিই পৌঁছাবে, আর কারও সুপারিশ লাগবে না, তা হলে কর্মসূচি নিজের জোরেই দাঁড়িয়ে যাবে। সেই বিশ্বাস একবার ভাঙলে বিজ্ঞাপন দিয়ে তা ফেরানো যায় না।

আস্থার প্রথম পরীক্ষা বসে তালিকা তৈরির মুহূর্তে। গ্রামে কে কত গরিব, তা পাড়ার সবাই জানে। কোনো সচ্ছল পরিবার কার্ড পেলে খবরটা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছড়িয়ে যায়, আর বাদপড়া সত্যিকারের অভাবী মানুষটি সরকারের ওপর থেকে ভরসা হারায়। পাইলটে এক লাখ ১২ হাজারের বেশি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ হয়েছে, কার্ড ও ভাতা পেয়েছেন ৭১ হাজার ৮৩১ জন। অর্থাৎ তথ্য দিয়েও বহু পরিবার তালিকার বাইরে থেকেছে। এখন ডিসেম্বরের মধ্যে সাড়ে চার কোটির মতো পরিবারের তথ্য নেওয়ার লক্ষ্য আছে, তাই বাদপড়া মানুষের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। প্রক্সি মিনস টেস্টিংয়ের (পিএমটি) মতো পদ্ধতি ভালো ভিত্তি, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি অচেনা হিসাব। কার কত নম্বর, কোন তথ্যে কী কাটা পড়ল, কেউ জানে না। অজানা জিনিস নিয়েই গুজব জন্মায়। তাই আমি মনে করি, ইউনিয়ন আর ওয়ার্ডে খসড়া তালিকা প্রকাশ্যে টাঙানো হোক, আপত্তি জানানোর সময় বেঁধে দেওয়া হোক, আর যে বাদ পড়ল সে যেন জানতে পারে কেন বাদ পড়ল এবং কোথায় আপিল করবে। যেখানে আলো পড়ে, সেখানে দালালের ছায়া ছোট হয়ে আসে।

দালালের কথা যখন উঠলই, তখন বলতে হয়, আমাদের দেশে বিলিযোগ্য যেকোনো সুবিধার চারপাশে একটা অদৃশ্য চক্র গড়ে ওঠে। বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ত্রাণ— সবখানেই আমরা তা দেখেছি। ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশাল কর্মসূচিতে সেই টান আরও প্রবল হবে, এটাই স্বাভাবিক। তথ্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের জন্য ছিষট্টি হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ হচ্ছে। এত বড় নিয়োগে নিজেদের লোক ঢোকানোর চেষ্টা হবেই। তাই বাছাইয়ের মানদণ্ড আগে থেকে প্রকাশ করা দরকার। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্থানীয় শিক্ষক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর ভরসা করলে মাঠের চাপ অনেক কমে। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের কাছে বার্তাটা হতে হবে পরিষ্কার— তালিকায় হাত দিলে দল নিজেই ব্যবস্থা নেবে। বার্তাটা প্রধানমন্ত্রী নিজের মুখে বারবার দিলে তার ওজন হবে সবচেয়ে বেশি।

এই ভার যাদের কাঁধে পড়ছে, সেই মাঠ প্রশাসনের কথাও আলাদা করে ভাবা দরকার। নীতি তৈরি হয় রাজধানীতে কিন্তু জয়-পরাজয় ঠিক হয় উপজেলার মাঠে। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন গ্রামের কোনো উঠোনে পৌঁছাবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউএনও, সমাজসেবা কর্মকর্তা আর মাঠকর্মীদের ওপর। তাদের মতামত না নিয়ে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিয়ে দায়িত্ব চাপালে কর্মসূচির গতি কমবে, ভুল বাড়বে। কোনো কর্মকর্তা হেনস্থার শিকার হলে প্রতিকার যদি দ্রুত আর দৃশ্যমান না হয়, তা হলে পুরো প্রশাসনে একটা বার্তা চলে যায়— ঝুঁকি নিয়ো না, ধীরে চলো। সেই ধীরগতির ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পোহায় সেই অভাবী পরিবার, যার জন্য কর্মসূচিটা। যারা কাজ করছেন, তারা যেন জানেন সরকার তাদের পাশে আছে, আস্থার এই দিকটাও কম জরুরি নয়।

এবার টাকার প্রশ্ন, কারণ আস্থা শুধু বিতরণে নয়, জোগানেও লাগে। অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন, যার ১২ হাজার ৩০০ কোটি ভাতা বিতরণের জন্য। এটা প্রায় ৪০ লাখ পরিবারের প্রথম ধাপের হিসাব। কিন্তু লক্ষ্য যখন চার বছরে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবার, তখন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়বে। রাজস্ব আহরণ যেখানে আমাদের পুরোনো দুর্বলতা, সেখানে এই ব্যয়ের টেকসই উৎস কী? উত্তর স্পষ্ট না থাকলে হয় কর্মসূচি সংকুচিত হবে, নয়তো ঘাটতি বাড়বে। দুটো পথেই বিতর্ক অপেক্ষা করছে। তাই কর্মসূচিকে আইনি কাঠামোয় আনা এবং বাজেটে আলাদা ও প্রকাশ্য বরাদ্দ রাখা দরকার। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর্মসূচির সঙ্গে দ্বৈধতা এড়াতেও সতর্ক থাকতে হবে। টিসিবি কার্ডকে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে আনার যে পরিকল্পনা আছে, সেটা সঠিক দিক। একই পরিবার একাধিক জায়গা থেকে পেয়ে অন্যজন বঞ্চিত হলে ক্ষোভ ছড়াবে। আরেকটি কথা আমি ভুলতে চাই না। হঠাৎ কোনো এলাকায় নগদ টাকা ঢুকলে স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে সরবরাহ যেখানে সীমিত। দাম বাড়লে সাহায্যের টাকার ক্রয়ক্ষমতাই কমে যায়। কাজেই বাজার তদারকি আর সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ কর্মসূচির সঙ্গে সমান্তরালে চলা উচিত।

টাকা কীভাবে হাতে পৌঁছাবে, সেটাও আস্থার অংশ। নারীর নিজের নামে ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত সঠিক, কারণ এতে মাঝপথের ফাঁক কমে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক গ্রামীণ নারীর নিজের ফোন নেই, জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানান ভুল থাকে, আর এজেন্টের কাছে টাকা তুলতে গিয়ে কমিশন গুনতে হয়। আড়াই হাজার টাকা থেকে কিছু কাটা গেলে সেটা তার কাছে মোটেই ছোট ঘটনা নয়। ক্যাশ-আউটে কোনো খরচ যেন না লাগে, কাছাকাছি ব্যাংক বা এজেন্ট যেন থাকে, আর ডিজিটাল লেনদেনের প্রশিক্ষণ যেন পায়, এটা নিশ্চিত করা দরকার। ব্যাংকিং খাতের মানুষ হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বলে, বিশ্বস্ত ব্যাংক ও এজেন্ট নেটওয়ার্ক ছাড়া এত বড় বিতরণ নির্ভুল হয় না।

আর সবশেষে আসে সেই প্রশ্ন, যেটা এখনই উঠছে না কিন্তু একদিন উঠবেই। অবস্থার উন্নতি হলে পরিবারটি কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাবে, এই ধারণা নীতিগতভাবে ভালো। কেউ চিরকাল নির্ভরশীল থাকুক, তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু কে ঠিক করবে একটি পরিবার আর দরিদ্র নেই? যে সুবিধা হারায়, সে ক্ষুব্ধ হয়। তাই বেরোনোর শর্ত শুরুতেই জানাতে হবে, আর বিদায়ের আগে পরিবারটিকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বা কাজের সুযোগের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। তা না হলে মানুষ সুবিধা হারানোর ভয়ে আয় বাড়ার খবরটাই লুকোবে, যা কর্মসূচির উদ্দেশ্যের একেবারে উল্টো।

এসব কিছুর ওপরে একটা স্বাধীন নজরদারির ব্যবস্থা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, নাগরিক সংগঠন আর সামাজিক নিরীক্ষকদের দিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন হলে ভুল ধরা পড়বে আগেই, আর শুধরে নেওয়ার কৃতিত্বও সরকারই পাবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা হবে। কথাটা কাজে দেখাতে পারলে সমালোচনার জায়গা আপনিই কমে যাবে। সমালোচনাকে ভয় পাওয়ার চেয়ে নিজে থেকে ভুল সারিয়ে নেওয়া অনেক বেশি শক্তিশালী নেতৃত্বের পরিচয়।

আমার বিশ্বাস, ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষার ইতিহাসে বড় একটি অধ্যায় হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যে সাহস আর আবেগ নিয়ে এগিয়েছেন, তাকে সম্মান জানিয়েই বলছি, এখন সময় গতির চেয়ে নির্ভুলতার, ঘোষণার চেয়ে স্বচ্ছতার। একটি স্বপ্ন তখনই সবার হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল নিয়ে কারও মনে প্রশ্ন থাকে না।

প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  
  বিষয়:   ফ্যামিলি কার্ড  আস্থা রক্ষা  পরীক্ষা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: