গ্রাফিক : সময়ের আলোপ্রতি বছর বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের হাতে থাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ, নিজ নিজ বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান এবং একটি ভালো কর্মজীবনের প্রত্যাশা। কিন্তু দ্রুত বদলে যাওয়া কর্মক্ষেত্রে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। শুধু ডিগ্রি কি একজন তরুণকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করতে পারছে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তন এখন শুধু নতুন পেশা তৈরি করছে না, বদলে দিচ্ছে বিদ্যমান পেশার কাজের ধরনও। একজন কর্মকর্তা কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করবেন, একজন গবেষক কীভাবে তথ্য অনুসন্ধান করবেন, একজন যোগাযোগকর্মী কীভাবে কনটেন্ট তৈরি করবেন কিংবা একজন উদ্যোক্তা কীভাবে বাজার সম্পর্কে ধারণা নেবেন, এসব কাজের প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। অর্থাৎ এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়। প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, গবেষণা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব বাড়ছে।
বিশ্বের শ্রমবাজারের পরিবর্তনের চিত্রও বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ বর্তমান কাজ স্থানচ্যুত হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কাজ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ পরিবর্তনের গল্পটি শুধু চাকরি হারানোর নয়; নতুন কাজ, নতুন পেশা এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরিরও। প্রশ্ন হলো, সেই পরিবর্তিত শ্রমবাজারে বাংলাদেশের তরুণরা কোথায় দাঁড়াবে?
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনমিতিক সুবিধা হিসেবে দেখি। কিন্তু শুধু বিপুলসংখ্যক তরুণ থাকলেই তা অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত হয় না। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা যদি শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে না মেলে, তা হলে সম্ভাবনাই উল্টো বেকারত্ব ও হতাশার চাপ বাড়াতে পারে। তাই কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি পাচ্ছেন, সেই হিসাবের পাশাপাশি তারা কী শিখছেন এবং সেই শিক্ষা দিয়ে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কী করতে পারছেন, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই আমাদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে। একজন শিক্ষার্থী চার বা পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর যদি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন চাকরি খোঁজার সময়, তা হলে প্রস্তুতির জায়গায় বড় ঘাটতি থেকেই যায়। কর্মজীবনের প্রস্তুতি শিক্ষাজীবনের শেষ প্রান্তের কোনো সংযোজন হতে পারে না। সেটিকে শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যেই যুক্ত করতে হবে।
তবে কয়েকটি জনপ্রিয় এআই টুলের ব্যবহার শেখানোই যথেষ্ট নয়। আজ যে টুল জনপ্রিয়, কয়েক বছর পর সেটি নাও থাকতে পারে। তাই এআই শিক্ষা হতে হবে সক্ষমতাকেন্দ্রিক। একজন তরুণকে জানতে হবে কোন সমস্যায় প্রযুক্তির ব্যবহার যৌক্তিক, কীভাবে সঠিক নির্দেশনা দিতে হয়, পাওয়া তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং প্রযুক্তির ফলাফলকে নিজের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও বিচারবোধ দিয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা শুধু এআই ব্যবহার করতে জানা নয়; বরং এআইয়ের সঙ্গে কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে জানা।
এই প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হঠাৎ শুরু করার বিষয়ও নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বয়স উপযোগীভাবে এআই সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যেতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে নিরাপদ ব্যবহার, তথ্য যাচাই ও নৈতিকতার সঙ্গে পরিচয় ঘটানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় সেটিকে গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান এবং কর্মজীবনের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ নয়, একটি ধারাবাহিক শেখার ব্যবস্থা।
দেশে ইতিমধ্যে এআই দক্ষতা উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের দেশব্যাপী এআই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬টি আবেদন জমা পড়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৬৪ জেলা থেকে ১ হাজার ৬০০ প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের কথা রয়েছে। এত বিপুল আবেদন তরুণদের মধ্যে এআই শেখার আগ্রহ কতটা বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষে অ্যাপ্লাইড আইসিটি কোর্সে পাঠদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের উদ্যোগে এবং এটুআইয়ের কারিগরি সহায়তায় শিক্ষায় এআই ব্যবহারে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মাস্টার ট্রেইনার পুল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদফতরও এআই দক্ষতা উন্নয়নে নানা উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করছে। সম্প্রতি এটুআইয়ের উদ্যোগে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত একটি এআই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেখানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, প্রশ্ন এবং নতুন প্রযুক্তি শেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাছ থেকে দেখেছি। এই আগ্রহ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ বা স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। কয়েক হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য এআই দক্ষতাকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা আরও জরুরি।
একই সঙ্গে সাফল্যের মাপকাঠিও শুধু কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন বা সনদ পেলেন, তা হওয়া উচিত নয়। প্রশিক্ষণের পর একজন তরুণ অর্জিত দক্ষতা বাস্তবে কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, তার সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেই দক্ষতা কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
একই সঙ্গে এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতনতা জরুরি। এআই ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ব্যবহারে রয়েছে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। শিক্ষা ক্ষেত্রে রয়েছে একাডেমিক সততার বিষয়। তাই এআই দক্ষতার সঙ্গে তথ্য যাচাই, উৎস পরীক্ষা, নৈতিকতা, গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বোঝানো অপরিহার্য। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল মানুষ তৈরি করা নয়, বরং প্রযুক্তিকে বিচারবুদ্ধি দিয়ে কাজে লাগাতে সক্ষম মানুষ তৈরি করা।
এআইয়ের সম্ভাবনাকে শুধু চাকরি পাওয়ার দক্ষতার মধ্যেও সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবায় বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যা সমাধানে তরুণদের এআই জ্ঞান কাজে লাগানোর বড় সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ যদি শুধু রাজধানী ও বড় শহরের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে প্রযুক্তি বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে নতুন দক্ষতা বৈষম্য তৈরি করতে পারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থী, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার তরুণ, নারী এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছেও শেখার সুযোগ পৌঁছাতে হবে।
এ জন্য উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় এআইয়ের ব্যবহারিক শিক্ষা বিস্তৃত করা, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের যোগাযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত দক্ষতা কাঠামোর আওতায় কাজ করতে হবে।
আমাদের প্রশ্ন তাই শুধু এআই কত মানুষের কাজ বদলে দেবে, সেটি নয়। আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, এআইয়ের কারণে যে নতুন কাজ, নতুন পেশা এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তার জন্য বাংলাদেশের তরুণদের আমরা কতটা প্রস্তুত করছি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, প্রস্তুতির। এআই কত দ্রুত এগোবে, সেটি বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য আমাদের তরুণদের কতটা প্রস্তুত করব, সেটি আমাদের হাতেই। আজ সেই প্রস্তুতিতে বিনিয়োগের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের তরুণরা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের শুধু অনুসারী হবে, নাকি নিজেদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে নতুন কাজ, নতুন সমাধান এবং নতুন সুযোগ তৈরির অংশীদার হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে