মূল্যস্ফীতির বহুমুখী চাপ : সঞ্চয় ভেঙে বাঁচার লড়াই

মতামত

সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙা কিংবা ঋণ করা কোনো পরিবারের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। বরং এটি আর্থিক সংকটের একটি বড়

2026-10-21T04:45:06+00:00
2026-10-21T04:45:06+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
মূল্যস্ফীতির বহুমুখী চাপ : সঞ্চয় ভেঙে বাঁচার লড়াই
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙা কিংবা ঋণ করা কোনো পরিবারের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। বরং এটি আর্থিক সংকটের একটি বড় লক্ষণ। ভবিষ্যতের বিপদ মোকাবিলা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অবসরজীবনের নিরাপত্তার জন্য মানুষ সঞ্চয় করে। আয়ের টাকায় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো যায় না, তখন সেই সঞ্চয়েই হাত দিতে হয়। বাংলাদেশের বহু পরিবারের এখন এমন অবস্থা। 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় না বাড়া, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিশেষ জরিপে জানা যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের ৪৭ ভাগের বেশি মানুষ ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বেড়েছে। যে কারণে সংসার চালাতে গিয়ে কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ঋণ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমানত জমার চেয়ে উত্তোলন বেশি হওয়ার এই প্রবণতা মানুষের আর্থিক চাপেরই ইঙ্গিত দেয়।

মানুষের আয় বাড়ার চেয়ে পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে বেশি। গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অথচ মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। নিত্যপণ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও শিক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে মানুষের হাতে টাকা থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাসের বাড়তি দাম। 

ফলে সংসারের অন্য খরচ কমাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাবার কেনা কমিয়ে দিচ্ছে। 

এই পরিস্থিতিতে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়। কারণ এসব পরিবার সরকারি সহায়তার আওতায় কম আসে। অথচ তাদেরও চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার মতো অপরিহার্য খরচ রয়েছে। সঞ্চয় শেষ হলে তাদের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। ঋণ যদি উৎপাদনশীল কাজের পরিবর্তে খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয় তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করে।

এই অবস্থায় নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাই সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করতে হবে। নাগরিকদের জন্য খাদ্যসহায়তা ও স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রির কর্মসূচির আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। ওএমএসের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্যও রেশনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা জরুরি। সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রতিটি খাতে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। শহরেও কর্মসৃজন কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা জরুরি। মানুষ যদি প্রতিদিনের খাবার কিনতে ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা ভাঙতে বাধ্য হয়, তা হলে তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? সঞ্চয় মানুষের দুর্দিনের ভরসা। সেই ভরসা হারিয়ে গেলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ থাকে না। তাই সঞ্চয় ভাঙার এই প্রবণতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনীতির জন্য গভীর সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   মূল্যস্ফীতি  বহুমুখী চাপ  সঞ্চয়  বাঁচার লড়াই  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: