গ্রাফিক : সময়ের আলোদেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এ দুর্ঘটনা রোধ ও কমিয়ে আনার জন্য বিখ্যাত চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। তারই প্রেক্ষিতে প্রতি বছর নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হয়ে আসছে। আজ নিরাপদ সড়ক দিবস।
সংবাদপত্রে যেসব দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ হয় তার বাইরেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত প্রত্যন্ত এলাকায় যেসব সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার সব খবর সংগ্রহ এবং সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন অনেক, তেমনি এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত, নিহত ও পঙ্গু হয়ে পড়া লোকের সংখ্যা হাজার হাজার। সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের জীবনে পঙ্গুত্বের অভিশাপ নেমে আসে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির চেয়ে পঙ্গুত্ব হওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি।
সম্প্রতি নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জনের প্রাণহানি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃষিপণ্যের বীজ কিনে মৌসুমি ব্যবসা শুরু করতে যাওয়া জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী, আট বছরের শিশু তাছফিয়া, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ— এক মুহূর্তে থেমে গেছে কত জীবনের পথচলা। অন্তত ৩২ জন আহত। শোকাহত পরিবারগুলোর কাছে এই ক্ষতি অপূরণীয়; আর সমাজের কাছে এটি সড়ক নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতার আরেকটি সতর্কবার্তা।
দুর্ঘটনার কারণ তদন্তাধীন। তবে একাধিক যাত্রীর বক্তব্য, ঈশ্বরদীর পর বাসের চালক ও সহকারী পেছনের আসনে বসে, আর সুপারভাইজার চালকের আসনে বসে বাস চালাতে থাকে। অভিযোগটি সত্য হলে তা শুধু দায়িত্বহীনতা নয়— যাত্রীদের জীবন নিয়ে ভয়াবহ অবহেলা। বাস চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বৈধ অনুমোদন ছাড়া কাউকে চালকের আসনে বসতে দেওয়া যায় না। চালক ক্লান্ত হলে বা বিশ্রামের প্রয়োজন হলে নিয়মমাফিক বিকল্প চালকের ব্যবস্থা করতে হবে; সুপারভাইজারকে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে তদন্তের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত হবে না। দুর্ঘটনার কারণ জানতে হবে— বাস ও ট্রাকের গতি, চালকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম, যানবাহনের যান্ত্রিক অবস্থা, সড়কের পরিস্থিতি এবং সংঘর্ষের মুহূর্তের তথ্য যাচাই করে তবেই সাব্যস্ত করা যাবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, গাড়ির নথি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ করে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। দায় যারই হোক, পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকের অসাবধানতা, অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, চালকদের অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা, অপ্রশস্ততা, প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশে নিরাপদ সড়ক ও চালক সচেতনতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ, কর্মসূচি চালু রয়েছে। তবু সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে না।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেখাল, সড়কে নিরাপত্তা শুধু চালকের সতর্কতার ওপর নির্ভর করে না। পরিবহন মালিকের দায়িত্বশীলতা, চালক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মান, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং আইন প্রয়োগ— সবকিছুই সমান জরুরি। দীর্ঘপথে চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে যোগ্য বিকল্প চালক রাখা পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হওয়া উচিত। নিয়ম ভাঙার পর কেবল জরিমানা নয়, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিও দরকার।
এখন প্রথম কাজ আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। এরপর প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন। শোকবার্তা বা সাময়িক ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাষ্ট্র ও পরিবহন খাতের দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতিটি প্রাণহানির পর একই প্রশ্ন ফিরে আসা উচিত— আগের দুর্ঘটনা থেকে কী শেখা হলো, আর পরেরটি ঠেকাতে কী বদলানো হলো?
সড়কে মানুষের জীবন কোনো পরিবহন প্রতিষ্ঠানের খরচের খাত নয়। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা চালক, মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের যৌথ দায়িত্ব। বড়াইগ্রামের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জবাব হতে হবে কঠোর তদন্ত, দৃশ্যমান জবাবদিহি এবং বাস্তব নিরাপত্তা সংস্কার— যাতে আর কোনো পরিবার প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় এমন মর্মান্তিক খবর না পায়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে