ছবি : সংগৃহীতদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, সেই সড়কেই প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক মানুষ। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে ‘নিরাপদ সড়ক’ এখনও নিশ্চিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের আতঙ্ক। সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি মানুষ। প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দেশের সড়ক যে কতটা অনিরাপদ তার একটি ধারণা মেলে এই হিসাব থেকে।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মালিকদের দায়িত্বহীনতা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে চালক-শ্রমিকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট নয়। তারা ট্রিপের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পান। বেশি আয় করতে গিয়ে তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান।
আবার ফিটনেসবিহীন অনেক যানবাহন সড়কে চলাচল করে। এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যথাযথ তদারকির অভাবে নিবন্ধন ও রুট পারমিটের শর্তও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে। শুধু চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টার ব্যবস্থা থাকা দরকার। পাশাপাশি মালিকদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতাও উপেক্ষা করা যায় না। দেশের অনেক স্থানেই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত ও ভাঙাচোরা সড়কপৃষ্ঠ যান চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সড়কের নকশা, বিপজ্জনক মোড়, পথচারী পারাপারের অনুপযুক্ত ব্যবস্থার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও ঝুঁকি বাড়ায়। এসব যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আলাদা সার্ভিস রোড নির্মাণ করা জরুরি। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে নকশাগত ত্রুটি সংশোধন, সাইন-সিগন্যাল স্থাপন, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা জরুরি।
যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তায় আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই। প্রায়ই মহাসড়কে বাস থামিয়ে অস্ত্রধারী ডাকাতরা যাত্রীদের টাকা ও মালামাল লুট করে। কোনো কোনো সড়কে দিনের বেলায় ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যে কারণে সড়ক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে নিয়মিত পুলিশের টহলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করার কথা বলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দুটি লক্ষ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, কারণ বিশ্লেষণ এবং গৃহীত উদ্যোগের ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
সরকারের একার পক্ষে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সব অংশীজনকেও ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিককে আইন মেনে চলতে হবে। যাত্রী ও পথচারীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সড়ককে নিরাপদ করার জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে