গ্রাফিক : সময়ের আলো পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি কেবল পাহাড়ি ও বাঙালির সম্পর্ক, ভূমিবিরোধ কিংবা সরকারের সঙ্গে কোনো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সীমান্তের নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব প্রশ্নের কোনোটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রায়ই ঠুনকো অজুহাতে অশান্ত হয়। কখনো পাহাড়ের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে একে অপরের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এখানকার পরিবেশ উত্তপ্ত করে, আবার কখনো দেশি-বিদেশি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর মদদে নানা তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়।
অতি সম্প্রতি রাঙামাটির সাজেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সেই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া, সাধারণ স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি-ধমকি বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক স্থানীয়দের বাড়িঘরে তল্লাশি অভিযান না চালানোর দাবিতে ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’ যৌথভাবে সড়ক অবরোধের ডাক দেয়।
এতে সাজেকে ঘুরতে আসা কয়েক হাজার পর্যটক আটকা পড়লে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে তাদের নিরাপদে বের করে আনার চেষ্টা করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তথাকথিত অবরোধকারীদের বাকবিতণ্ডা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সৃষ্টি হয়। এর পরপরই সেনাবাহিনী ও একটি সশস্ত্র আঞ্চলিক দলের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই সংঘর্ষ ও হামলার জন্য পার্বত্য শান্তিচুক্তিবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করা হলেও ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই সংঘর্ষের গভীরতর কারণ লুকিয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিসিজেএসএস (সন্তু লারমার দল) এবং ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি নতুন কিছু নয়। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগত বৈচিত্র্য, ভূমি ও বসতিসংক্রান্ত বিরোধ এবং বহিঃশক্তির কৌশলগত প্রভাব এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে দীর্ঘদিন ধরেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক জটিল অধ্যায়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খিয়াংসহ প্রায় ১১টি প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতির পাশাপাশি রয়েছে সমতল থেকে আসা বাঙালি জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর থেকেই এখানকার রাজনৈতিক কাঠামোতে বিভাজন ও অবিশ্বাস প্রবল হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এসএস উবানের তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার্স ফোর্স (এসএফএফ) এবং মুজিব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে অভিযান চালায়। এর অন্যতম প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ করা।
ভারত সরকারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ছিল যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মিজো ও নাগার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। একই সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ও জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেন।
পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যকার জাতীয়তার দ্বন্দ্ব স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাতেই তৈরি হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সব নাগরিককে এককভাবে ‘বাঙালি’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের জুম্ম পরিচয় হারানোর আশঙ্কায় চরম অসন্তুষ্ট হয়। সেই অসন্তোষের জেরে এবং ভারতের মদদে ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ (পিসিজেএসএস)।
পরবর্তীতে তারা তাদের সামরিক শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ গড়ে তোলে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। ভূখণ্ডভিত্তিক এই ধারণার ফলে পাহাড়ি জনগণ জাতিগত পরিচয় বজায় রেখেও নাগরিক হিসেবে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ের সুযোগ পান। তবে এটি তাদের স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক অধিকারের মূল দাবি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
পাহাড়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলা ও সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তিনি সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেন। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য আনতেই তিনি সমতলের হাজার হাজার বাঙালি পরিবারকে পাহাড়ে পুনর্বাসিত করেন। এই পদক্ষেপের ফলে পাহাড়ের জনসংখ্যার বিন্যাসে বড় পরিবর্তন আসে, যা দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে ভূমিসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। অন্যদিকে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করেন।
সার্বিকভাবে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও জনসংখ্যা পুনর্বাসন নীতি পাহাড়ের জাতিগত ও ভূমিসংক্রান্ত সংকটকে পরবর্তীতে আরও জটিল করে তোলে। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পাহাড়ি বিদ্রোহ দমনে শান্তি আলোচনা শুরু করে। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার মধ্যে শান্তি চুক্তি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষক নূর আহমেদের ‘দ্য রিকারেন্স অব সিকিউরিটি চ্যালেঞ্জেস ইন চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস (সিএইচটি) : এক্সপ্লোরিং রুট কজেস’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ২০২৫ সালে বিআইআইএসএস জার্নালের ৪৬তম খণ্ডের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, প্রশাসনিক তথ্য এবং স্থানীয় নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকট বিশ্লেষণ করেছে।
এতে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও শান্তিবাহিনীর প্রতি বহুমাত্রিক সহায়তার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণায় সংঘাতের পুনরাবৃত্তির পেছনে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে ঘাটতি, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ভূমি বিরোধ ও জাতিগত বিভাজনের মতো অভ্যন্তরীণ কারণগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতাকে কেবল বিদেশি হস্তক্ষেপ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
২০২৬ সালে ‘পাকিস্তান হরাইজন’ এ প্রকাশিত ড. মনজুর আহমদ নাজিরের ‘ইউজ অব টেরোরিজম অ্যাজ এ টুল অব ফরেন পলিসি : কেস স্টাডি অব ইন্ডিয়ান সাপোর্ট টু চাকমা ইনসারজেন্সি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি আরও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার পেছনে সরাসরি ভারতের সম্পৃক্ততার প্রশ্ন তুলেছে। লেখক ১৯৭৫ সাল থেকে চাকমা বিদ্রোহ ও শান্তিবাহিনীর প্রতি ভারতের সম্ভাব্য সহায়তা এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ভূমিকা, আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক সমর্থনের অভিযোগ বিশ্লেষণ করেছেন। তার মূল যুক্তি হলো, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, বিশেষ করে ত্রিপুরা ও চাকমারা, ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে ঘনিষ্ঠ। এই নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে মানবিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা বলে প্রভাব বিস্তার করে এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অশান্ত করে তোলে। এতে বিশেষ করে চাকমা নেতৃত্বের প্রাধান্য নিয়ে মারমা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বিদ্যমান। বাংলাদেশে বাঙালি ও পাহাড়িদের সহাবস্থান ও একটি অনিবার্য বাস্তবতা। তবে এই সহাবস্থান কখনো মসৃণ হয়নি।
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুললেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা সহাবস্থানের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মতে চব্বিশের পর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের এই শীতলতার সুযোগে বাংলাদেশে কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক চাপ তৈরি করতে ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্যবহার করার আশঙ্কা নতুন করে তৈরি হয়েছে, যা অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি কেবল পাহাড়ি ও বাঙালির সম্পর্ক, ভূমিবিরোধ কিংবা সরকারের সঙ্গে কোনো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সীমান্তের নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব প্রশ্নের কোনোটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাসে অন্য কোনো শক্তির ভূমিকা নিয়ে যে তথ্য ও গবেষণা রয়েছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি কোনো পক্ষের সহায়তা পাচ্ছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব