সতর্কতা ও সার্বক্ষণিক নজরদারিই সুরক্ষার হাতিয়ার

মো. নাজমুল হুদা মাসুদ

মতামত

বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাইবার স্পেস কেবল কোনো ভার্চুয়াল বিনোদন ক্ষেত্র নয়; এটি এখন স্থল, জল, অন্তরীক্ষ ও মহাকাশের

2026-10-25T06:21:11+00:00
2026-10-25T06:39:19+00:00
 
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
সাইবার হামলার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
সতর্কতা ও সার্বক্ষণিক নজরদারিই সুরক্ষার হাতিয়ার
মো. নাজমুল হুদা মাসুদ
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:২১ এএম  আপডেট: ২৫.১০.২০২৬ ৬:৩৯ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাইবার স্পেস কেবল কোনো ভার্চুয়াল বিনোদন ক্ষেত্র নয়; এটি এখন স্থল, জল, অন্তরীক্ষ ও মহাকাশের পর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ‘পঞ্চম মাত্রা’। এই পঞ্চম ক্ষেত্রে কোনো দেশ যদি দুর্বল থাকে, তবে দেশের অর্থনীতি, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক তথ্য এমনকি অবকাঠামোগত মূল চালিকাশক্তি মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের পর দেশ যখন ক্যাশলেস সোসাইটি ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার চূড়ান্ত অভিযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এক অদৃশ্য ও মারাত্মক দূরবর্তী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ। 

আর সেই সংকটটির নাম— সাইবার হুমকি’। অতি সম্প্রতি দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, ব্যাংক-বীমা, জাতীয় তথ্য ভান্ডার, চিকিৎসা সেবা এবং আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ঘন ঘন সাইবার হামলার চেষ্টা বা হুমকির খবর সামনে আসছে। 

এতে কেবল সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও কষ্টার্জিত অর্থই ঝুঁকিতে পড়ছে না বরং চরম হুমকির মুখে পড়েছে সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তা। এ বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষাকে কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একটি ছোটখাটো দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

১. প্রযুক্তির প্রসার বনাম নিরাপত্তাহীনতার সমীকরণ
গত এক দশকে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসার ঘটেছে। ব্যাংক থেকে শুরু করে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি, সরকারি ই-সেবা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবস্থাপনা— সবই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল কাঠামোর ব্যবহার আমাদের জীবনকে যেমন সহজ, দ্রুত ও গতিশীল করেছে, তেমনি নেটওয়ার্ক ও প্ল্যাটফর্মের ওপর আমাদের নির্ভরতা বাড়িয়েছে বহুগুণ।

কিন্তু এই দ্রুতগামী অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্যের নিরাপত্তার যে শক্ত প্রতিরোধব্যূহ গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, সেখানে রয়ে গেছে গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া ঘাটতি। বিশ্বজুড়ে সাইবার অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পেশাদার হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো এখন আর কেবল কৌতূহল মেটাতে বা ছোটখাটো অর্থ হাতানোর জন্য হামলা চালায় না; তারা এখন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি, সার্ভিস বিকল করা, ওয়েবসাইট বিকৃত করা এবং ‘র‌্যানসামওয়্যার’ হামলার মাধ্যমে পুরো একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশ আজ এই আন্তর্জাতিক সাইবার ভূরাজনীতি ও অপরাধ চক্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

২. কেন বাংলাদেশ সাইবার হামলার ঝুঁকিতে?
আমাদের দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো কেন বারবার সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে— তার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে গভীর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন : হালনাগাদ সফটওয়্যার ও পাইরেসির ব্যবহার : দেশের সিংহভাগ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনও আনলাইসেন্সড বা পাইরেটেড সফটওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল বা অরিজিনাল সফটওয়্যার ও আধুনিক ফায়ারওয়াল কেনাকে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মনে করেন। এই পাইরেটেড সফটওয়্যারের ব্যাকডোর দিয়েই হ্যাকাররা অনায়াসে সিস্টেমে ঢুকে পড়ে।

নিরাপত্তাকে ‘অতিরিক্ত খরচ’ বিবেচনা করা : বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই প্রযুক্তি বাজেটের একটি অত্যন্ত নগণ্য অংশ সাইবার সিকিউরিটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। সিকিউরিটি অডিট, ডেটা এনক্রিপশন, অফসাইট ব্যাকআপ এবং আধুনিক হুমকি চিহ্নিতকরণ সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের কৃপণতা বা উদাসীনতা লক্ষ করা যায়।

ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের দুর্বলতা : রাষ্ট্রকর্তৃক ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বা সিআইআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকটিতেই আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলা হয় না। ফলে একটি সংবেদনশীল সার্ভারে অনুপ্রবেশ করতে পারলে হ্যাকাররা সহজেই মূল ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়।

মানবসম্পদের অসচেতনতা : বিশ্বজুড়ে যত সাইবার হামলা ঘটে, তার প্রায় ৮০ শতাংশেরই বড় কারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অসচেতনতা। কোনো জটিল উচ্চপ্রযুক্তির কোডিং না করে হ্যাকাররা প্রায়ই পাঠায় অতি সাধারণ ‘ফিশিং’ ইমেইল, ভুয়া লিংক কিংবা লোভনীয় প্রস্তাবের অফার। প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা না বুঝে সেই লিংকে ক্লিক করলেই হ্যাকারের হাতে চলে যায় পাসওয়ার্ড ও এক্সেস প্রটোকল।

৩. সুরক্ষার টেকসই কৌশল : যা এখনই করতে হবে
হুমকি ও ঝুঁকি মোকাবিলায় কেবল ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা কিংবা কিছুদিন ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার মতো সাময়িক ও অকার্যকর পদক্ষেপ কোনো সমাধান এনে দেবে না। সাইবার হামলা সফলভাবে প্রতিরোধে আমাদের প্রয়োজন একটি বহুমুখী, সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী জাতীয় কৌশল।

(ক) ২৪/৭ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সাড়াদান
দেশের প্রতিটি ব্যাংকিং খাত, টেলিকম সেক্টর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং সরকারি মূল সার্ভারগুলোতে ২৪/৭ ঘণ্টা নিরাপত্তা নজরদারি বা সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার সক্রিয় রাখতে হবে। নেটওয়ার্কে কোনো অস্বাভাবিক ডাটা আদান-প্রদান বা সন্দেহজনক আইপি থেকে লগইনের চেষ্টা দেখামাত্রই যেন ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল’-এর ই-গভর্নমেন্ট সার্ট তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, সেই সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে হবে।

(খ) নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট ও পেনিট্রেশন টেস্টিং 
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বছরে অন্তত ২ থেকে ৪ বার ‘ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড পেনিট্রেশন টেস্টিং’ পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মানে হলো, নীতিগতভাবে একজন ‘হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার’ বা সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ দিয়ে নিজেদের সিস্টেমকে আক্রমণ করিয়ে দেখে নেওয়া— কোথায় দুর্বলতা বা ফাঁকফোকর আছে। হ্যাকাররা সুযোগ নেওয়ার আগেই নিজেদের ত্রুটি নিজেদেরই খুঁজে বের করে মেরামত করতে হবে।

(গ) দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি
আন্তর্জাতিক সাইবার যুদ্ধের যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল। দেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার সিকিউরিটি ও এআইভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বিষয়ক বিশেষায়িত ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্স বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতিনিয়ত ডিজিটাল হাইজিন ও ডেটা সিকিউরিটি বিষয়ে প্রাক্টিক্যাল ওয়ার্কশপ করানো জরুরি।

(ঘ) জাতীয় সাইবার ফ্রন্টলাইন ও এআইয়ের ব্যবহার
আধুনিক সাইবার হামলায় এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আমাদের প্রতিরক্ষাতেও এআইচালিত সিকিউরিটি টুলস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা নিমেষের মধ্যে লাখ লাখ ট্রাফিক বিশ্লেষণ করে ক্ষতিকারক ফাইল বা ম্যালওয়্যার শনাক্ত করতে পারে। একইসঙ্গে বিশ্বমানের হুমকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করতে হবে।

(ঙ) সাধারণ নাগরিক সচেতনতা
সাইবার সুরক্ষা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে পাসওয়ার্ড ব্যবহারের সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেমন একই পাসওয়ার্ড সব ক্ষেত্রে ব্যবহার না করা। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা। অপরিচিত ইমেইল, এসএমএস বা সোশ্যাল মিডিয়ার লিংকে হুট করে ক্লিক না করা। পাইরেটেড সফটওয়্যার বা থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহারের অভ্যাসে রাশ টানা।

৪. ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাইবার স্পেস কেবল কোনো ভার্চুয়াল বিনোদন ক্ষেত্র নয়; এটি এখন স্থল, জল, অন্তরীক্ষ ও মহাকাশের পর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ‘পঞ্চম মাত্রা’। এই পঞ্চম ক্ষেত্রে কোনো দেশ যদি দুর্বল থাকে, তবে দেশের অর্থনীতি, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক তথ্য এমনকি অবকাঠামোগত মূল চালিকাশক্তি মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ এখন একটি উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতি। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হলে আমাদের সাইবার প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তায় বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচ নয় বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। 

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই যে সাইবার বিশ্বের মূলমন্ত্র— এই সত্যটি অনুধাবন করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারিকেই আমাদের সুরক্ষার মূল হাতিয়ার বানাতে হবে। তবেই নিরাপদ থাকবে আমাদের নাগরিক ডেটা, সুরক্ষিত থাকবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব।

লেখক : প্রকৌশলী স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ 
মতামত লেখকের নিজস্ব
  বিষয়:   সতর্কতা  সাইবার হামলা  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: