গ্রাফিক : সময়ের আলোদেশে চালের উৎপাদন ও মজুদ সন্তোষজনক। পরপর দুই মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামে যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুদ আছে। বড় চালকল মালিকদের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান-চাল মজুদ আছে। এরই মধ্যে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। এর ফলনও ভালো হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও চালের বাজারে স্বস্তি নেই।
সময়ের আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে কেজিতে দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। প্রধান খাদ্যপণ্যটির এমন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যাপ্ত উৎপাদন ও মজুদ থাকার পরও চালের দাম বাড়ছে কেন?
ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়ার জন্য পরিবহন খরচকে দায়ী করছেন। তা ছাড়া তাদের বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। তাদের যুক্তি, মোকাম থেকে চাল আনতে খরচ বাড়লে বিক্রয়মূল্যেও তার প্রভাব পড়ে। এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। তবে সেই খরচ বাস্তবে কতটা বেড়েছে এবং চালের দামে তার প্রভাব কতটা পড়েছে সেটা যাচাই করা দরকার।
সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি মিল পর্যায়ে চাল মজুদ রেখে বাজারে সরবরাহ কমানো হয় তা হলে খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে। মিল, পাইকারি আড়ত ও খুচরা দোকানে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান কতটা সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো ব্যবসায়ী নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখতে হবে। কেউ কারসাজি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চালের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও সবজির উচ্চমূল্যে এমনিতেই মানুষ বিপাকে রয়েছে। এর মধ্যে আটা-ময়দার দামও বেড়েছে। সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে নাগরিকদের পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এ অবস্থায় বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা বাড়ানো জরুরি। শুধু দাম বেড়ে যাওয়ার পর অভিযান চালালে হবে না। উৎপাদন ও মজুদ থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে। চালকল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের চাল মজুদের তথ্য যাচাই করতে হবে। কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। পরিবহন খরচ, মিলগেটের দাম এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কোনো স্তরে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চালের বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সেটা করা গেলে গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ীর পক্ষে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রির ব্যবস্থাও জোরদার করা যেতে পারে।
নতুন আমন ধান বাজারে এলে সরবরাহ বাড়বে। এতে চালের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ধান উঠলেই খুচরা বাজারে দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন ও মজুদের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও মজুদ নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব নয়। নাগরিকরা ন্যায্যমূলে খাদ্যপণ্য কিনতে পারছেন কি না, সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে