গ্রাফিক : সময়ের আলো সৃষ্টিকর্তার এক অপরূপ সৃষ্টি মানুষ। অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই পৃথিবীতে মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। কবির ভাষায়, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে।’ কবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলা যায়, মৃত্যুই একমাত্র চিরন্তন সত্য। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার যেন কোনো সীমা নেই। আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে; কিন্তু তার অসীম চাহিদা পূরণের উপকরণ সীমিত। অর্থনীতির ভাষায়, অসীম চাহিদার মধ্য থেকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে মানুষকে তার প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করতে হয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদার ধরন এবং তা পূরণের উপকরণেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জমিজমা কিনত, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। অথচ কালের পরিক্রমায় ভোগবিলাসের পরিধি এমনভাবে বেড়েছে যে, কোনো না কোনো বিলাসদ্রব্যের অভাব যেন মানুষের অতৃপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোগবাদী সমাজে পণ্যের পসরা যেমন মানুষকে আকৃষ্ট করছে, তেমনি বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ফলে একদিকে বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের সমাহার, অন্যদিকে সমান্তরালভাবে বাড়ছে বিলাসদ্রব্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ। আগে একটি ফ্রিজেই পরিবারের প্রয়োজন মিটত; এখন একাধিক ফ্রিজ না থাকলে যেন আভিজাত্যে ঘাটতি থেকে যায়। পুরো বাসায় একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র যথেষ্ট ছিল, এখন প্রতিটি শোবার ঘরেই শোভা পাচ্ছে আলাদা এয়ারকন্ডিশনার। হাতে আইফোন না থাকলে, কানে এয়ারবাড না জড়ালে যেন আধুনিকতার পরিচয়ই অসম্পূর্ণ! নিত্যনতুন প্রযুক্তিপণ্য মধ্যবিত্তের জীবনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে, প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যকার সীমারেখাটিই ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই দাপটে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, গিয়ারযুক্ত বাইসাইকেল কিংবা ব্র্যান্ডের নতুন গাড়ি— এসবের অনুপস্থিতিতে অনেকের কাছে জীবনটাই যেন বিবর্ণ। সুন্নতে খতনা সনাতনী সমাজে উৎসবের আমেজ তৈরি করলেও হালে সার্জন, হাসপাতাল এবং বিলের আধিক্য না থাকলে যেন জাত গেল জাত গেল ভাব। অথচ নব্বই দশকে স্কুলে পড়ার দিনগুলোতে আমাদের এত বাহারি শব্দ শেখানো
হতো না; শেখানো হতো নীতিনৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পাঠ। তখন বস্তুগত প্রাপ্তির চেয়ে মূল্যবোধের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।
বর্তমান প্রজন্মের চাহিদার যেন শেষ নেই। অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র মা-বাবারাই সন্তানদের হাতে তুলে দেন। নতুন কিছু পেলেও তাদের আনন্দ যেন উপচে পড়ে না। চাওয়ার আগেই সবকিছু পেয়ে গেলে কি প্রাপ্তির আনন্দ ক্রমশ মøান হয়ে যায়? আমাদের শৈশবে সারা বছর অপেক্ষার পর ঈদে একটি নতুন জামা পেলেই আনন্দে মন ভরে উঠত। অবশ্য এটাও সত্য, তখনকার সময়ে এত বাহারি ও ফ্যাশনেবল পণ্য মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যেও ছিল না। ট্যুর, রিইউনিয়ন, রিসোর্টে রাতযাপন— এত আয়োজনের চলও ছিল না। এখন ইভেন্টের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সাজসজ্জার বাহার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকদেখানো সংস্কৃতি। কার পোশাক কত দামি, কার জুতা কোন ব্র্যান্ডের— এসব নিয়ে মানুষের আগ্রহও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সাজপোশাকে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াটাও যেন সামাজিক ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, এক অনুষ্ঠানের পোশাক পরা ছবি একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে গেলে সেটি অন্য অনুষ্ঠানে পরতে সংকোচ তৈরি হয়। তাতে যেন সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে!
শুধু বাহ্যিক সাজসজ্জায় নয়, ভোজনবিলাসেও চাই উচ্চমার্গীয় আয়োজন। নতুন কোনো অভিজাত রেস্তোরাঁয় গিয়ে সেলফি তুলতে না পারলে বন্ধুদের আড্ডায় যেন জায়গা পাওয়াই কঠিন! খাবারের স্বাদ গ্রহণের চেয়ে আকর্ষণীয় ছবি তোলার নেশাই কখনো কখনো মুখ্য হয়ে ওঠে। ইদানীং অনেক রেস্তোরাঁয় ছবি তোলার উপযোগী আলাদা কর্নারও রাখা হয়। কেননা প্রতিযোগিতার এই বাজারে অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলে ব্যবসায়িক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবেই ভোগের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভোগের প্রদর্শনই অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ কিংবা বিমানে ভ্রমণের সময় ফেসবুকে নিজের অবস্থান জানান না দিলে যেন ভ্রমণের আনন্দই অসম্পূর্ণ! প্রযুক্তিপণ্য, পোশাক কিংবা খাবার— যা-ই হোক না কেন, অন্যের কাছে তা প্রদর্শন করতে না পারলে নিজের সুখও যেন অধরা থেকে যায়। অথচ সুখের প্রকৃত উপলব্ধি তো অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা নয়।
আজকাল সন্তানদের স্কুল থেকে আনতে অপেক্ষমাণ মায়েদের আড্ডার বিষয়েও এসেছে পরিবর্তন। সংসারের চেনা গল্প ছাপিয়ে আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে হালফ্যাশনের পোশাক, নতুন রেস্তোরাঁ কিংবা আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এসব আলোচনার সবটাই যে লোকদেখানোর জন্য, তা নয়; তবে অনেক ক্ষেত্রে অন্যের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরার প্রবণতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। অথচ এই প্রদর্শনপ্রবণতা থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে যদি চাহিদাকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যেত, জীবন হয়তো আরও সহজ, স্বস্তিদায়ক ও সুন্দর হতো। অর্থ অনর্থের মূল— কথাটি সর্বাংশে সত্য না হলেও অর্থের অপব্যবহার যে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তাতে সন্দেহ নেই। অর্থকে যদি অপচয় ও লোকদেখানো প্রতিযোগিতার পরিবর্তে গঠনমূলক, মানবিক ও ইতিবাচক কাজে ব্যয় করা যায়, তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ— সব ক্ষেত্রেই সুস্থতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
পরিমিত জীবনযাপন করতে চাইলেও পারিপার্শ্বিকতার চাপ উপেক্ষা করা সহজ নয়। সামাজিক প্রত্যাশা, অন্যের জীবনযাত্রার সঙ্গে তুলনা এবং নতুন পণ্যের অবিরাম হাতছানি— সব মিলিয়ে চাহিদা প্রায়ই সামর্থ্যরে সীমা অতিক্রম করে যায়। প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় উভয় ধরনের ব্যয়ের ভার বহন করতে করতে মধ্যবিত্তের জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন শপিং, অনলাইন গেমিং এবং ডিজিটাল জগতের নানা আকর্ষণ। সবকিছু উপেক্ষা করে চাহিদাকে সীমিত রাখা সত্যিই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
তবে সবাই যে ভোগবাদের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন, তা নয়। কেউ কেউ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও নিজের মতো করে ভালো থাকার চেষ্টা করেন। কারণ, সুখী হওয়ার জন্য সবকিছু অর্জন করা জরুরি নয়; বরং যা আছে, তার যথাযথ মূল্য উপলব্ধি করাও সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। পরিমিত জীবনযাপন করতে না পারলেও অন্তত নিজের চাহিদাকে সামর্থ্যরে সীমার মধ্যে রাখা জরুরি। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, নিজের প্রয়োজন ও সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে পারে স্বস্তিময় জীবনের চাবিকাঠি। মনে রাখতে হবে, জীবনের সার্থকতা কতটা অর্জন করলাম কিংবা কতটা প্রদর্শন করলাম, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কতটা তৃপ্তি, স্বস্তি ও মানবিকতা নিয়ে বাঁচতে পারলাম, তার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।
সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা