ড. মো. আনোয়ার হোসেন
গ্রাফিক : সময়ের আলো বৈধ কিংবা অবৈধপথে ভাগ্যান্বেষণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন বহু বাংলাদেশি। তাদের একাংশ বিদেশের কারাগার ও আটককেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তার অভাবে তাদের বন্দিজীবন শুধু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত দেশে ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রথমেই মহাদেশ ও দেশভিত্তিক বাংলাদেশি বন্দিদের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কারাগারে কয়েক হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের দমদম ও আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার ৫৭৯ জন এবং মালয়েশিয়ার কাজাং কারাগারে ২১৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক আটক রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অনুমতিপত্র না থাকা এবং পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদের কেন্দ্রীয় কারাগারে ৭ হাজার ৫০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া ওমানের কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪২০ জন এবং ইরাকের আবু গারিব কারাগারে ২১৭ জন বাংলাদেশির আটক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শ্রম আইন ও অভিবাসনবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আটককেন্দ্রেও বাংলাদেশিদের আটকের বিষয়টি উদ্বেগজনক। গ্রিসের থেসালোনিকি কারাগারে ৪১৪ জন এবং তুরস্কের এদিরনে বন্দিশালায় ৫০৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক আটক রয়েছেন বলে দাবি
করা হয়েছে। সীমান্ত অতিক্রম ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের অনেকে আটক হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফ্রিকার লিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দিশিবিরেও বাংলাদেশি নাগরিকদের আটকে থাকার খবর রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ কেন্দ্রীয় কারাগারে ১১ জন এবং লিবিয়ার ত্রিপোলি আটককেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের অনেকে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আটককেন্দ্রেও বাংলাদেশি নাগরিকদের বন্দি থাকার কথা জানা যায়। মেক্সিকোর তাপাচুলা আটককেন্দ্রে ৯৭ জন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্ত অতিক্রম ও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের অনেকে আটক রয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের সাও পাওলো কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নের আটককেন্দ্রে ৩৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মালদ্বীপের মাফুশি কারাগারে ৭০ জন এবং লেবাননের রুমি কারাগারে ২৮ জন বাংলাদেশি বন্দি থাকার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা, হালনাগাদ অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি অবস্থান যাচাই করা জরুরি। কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি, বিচারাধীন আসামি এবং অভিবাসন আইনে আটক ব্যক্তিরা এক শ্রেণির নন। তাদের আইনি অবস্থার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে দেশভিত্তিক সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। যাচাই করা তথ্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব মিশনের সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার হলে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা, দোভাষীর ব্যবস্থা এবং মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিধি মেনে আটক বিদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি বন্দিদের
ক্ষেত্রে এই সুযোগ কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলা, রায়ের বিবরণ এবং আইনি সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা কী ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, আপিলের সুযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বিদেশে বন্দি বাংলাদেশিদের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি মিশনে আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, অবস্থান, মামলার নম্বর, অভিযোগ, সাজার মেয়াদ এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য রাখতে হবে। এসব তথ্যের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে পারে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করে বন্দিদের পরিবারের জন্য তথ্য জানার সহজ ব্যবস্থা করতে হবে।
ভাষাগত সমস্যাও বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা। অনেকেই গন্তব্য দেশের ভাষা জানেন না। ফলে অভিযোগ বুঝতে, আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে কিংবা আদালতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে তাদের অসুবিধা হয়। বাংলাদেশ মিশনগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী দোভাষী ও আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র বন্দিদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্প খরচে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করাও জরুরি।
সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভ্রমণ অনুমতিপত্র কিংবা বিমান ভাড়ার অভাবে কেউ কেউ দেশে ফিরতে পারেন না। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বন্দিদের মুক্তির সম্ভাব্য তারিখের আগেই দেশে ফেরানোর প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভ্রমণ নথি সংগ্রহ, পরিচয় যাচাই এবং যাত্রার ব্যবস্থা করতে হবে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল বন্দিদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মিশনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করা দরকার। তারা নিয়মিত কারাগার ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করবেন, বন্দিদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং তাদের সমস্যা সম্পর্কে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিবেদন দেবেন। বন্দিদের পরিবারের জন্য একটি সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা বন্দির অবস্থান, মামলার অগ্রগতি এবং দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে জানতে পারবেন।
বিদেশের কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে অবশিষ্ট সাজা ভোগের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বন্দি স্থানান্তরবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, চুক্তির শর্ত এবং বন্দির সম্মতির ওপর নির্ভর করবে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এ সুযোগ বাড়ানো গেলে বন্দিরা পরিবারের কাছাকাছি থেকে সাজা ভোগ করতে পারবেন।
অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অনেক বাংলাদেশি দালালদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণপথে বিদেশে যান। কেউ কেউ জাল নথি ব্যবহার করেন কিংবা পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হন। এসব অপরাধ প্রতিরোধে দালাল ও মানব পাচারকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও জনশক্তি রফতানিকারকদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের গন্তব্য দেশের আইন, অভিবাসনবিধি, শ্রম অধিকার ও জরুরি সহায়তা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্স বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে, জরুরি মামলাগুলো চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিদেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের দুর্দশা লাঘব শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। এ জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা, কূটনৈতিক তৎপরতা, দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং মানব পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাসীদের উপার্জনে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হয়। তাই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের স্বজনদের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি