গ্রাফিক : সময়ের আলো সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া ও দয়াগঞ্জ রেললাইন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে নিজের লোকবল নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান চালান সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। অভিযানের সময় তার হাতে প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখা যায়, এমনকি তার দলের লোকেরা কথিত ‘মাদকসেবীদের’ লাথি মারে এবং পাশ থেকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলে হুমকি দিতে শোনা যায়। পুরো ঘটনার ভিডিও ইশরাকের নিজস্ব ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগের ঝড় ওঠে।
এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে সরকার ও বিএনপি দলীয় হাইকমান্ডের ভেতরেও ব্যাপক অস্বস্তি দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ইশরাক হোসেন পদত্যাগপত্র জমা দিলে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তা গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ইশরাককাণ্ডের এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে যদি কেবল একজন ব্যক্তির আবেগপ্রবণ ভুল হিসেবে দেখা হয়, তবে রাজনীতির আসল পাঠ অধরা থেকে যাবে। কারণ এই ঘটনাটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক নীতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক অপরিপক্বতা এবং আইনি শাসনব্যবস্থার গভীর সংঘাতকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে।
ইশরাক হোসেনের এই কর্মকাণ্ডে প্রথমেই দেশের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন দেখা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা’র ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র থাকলেও জনমনে ভয়, আতঙ্ক বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে— এমনভাবে তা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও ইশরাক দাবি করেছেন যে আত্মরক্ষার্থেই তিনি ও তার লোকজন অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে তিনি নিজেই অস্ত্র উঁচিয়ে মানুষের দিকে ধাওয়া করছেন।
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, গুলি করার হুমকি দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের ওপর শারীরিক বলপ্রয়োগ ফৌজদারি আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) নির্দেশে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু আইনি ব্যাখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিচারে বৈধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার কেবল রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। কোনো জনপ্রতিনিধি যখন নিজস্ব লোকবল নিয়ে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে ধাওয়া করেন, তখন তা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ভিজিলান্টিজম’ বা বেআইনিভাবে নিজে আইন হাতে তুলে নেওয়ার নামান্তর। আইন প্রণেতা নিজে বিচারক ও পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
তবে এই পুরো কাণ্ডে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ওঠে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা নিয়ে। ইশরাক হোসেন নিজেই তার বিবৃতিতে স্বীকার করেছেন যে, দয়াগঞ্জ ও গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট থানায় আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
দেশের রাজধানীর বুকে একটি জনবহুল এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে কীভাবে প্রকাশ্যে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট ও আস্তানা গড়ে ওঠে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ প্রশাসন সেখানে কী ভূমিকা পালন করছিল? যখন কোনো এলাকায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতায় মাদক ব্যবসা অবাধে চলে, তখন তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদারকির চরম ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইশরাকের ঘটনার পরই পুলিশ ও যৌথ বাহিনী যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ইশরাকের পদত্যাগের পরপরই দয়াগঞ্জের সেই একই স্পটে পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর একযোগে অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে আটক করে এবং আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। যে কাজ পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর ধরে করতে ব্যর্থ হলো বা করতে চায়নি, একজন মন্ত্রীর বিতর্কিত ভিজিলান্টিজমের পর এক দিনের মাথায় তারা সেই কাজ ঠিকই সম্পন্ন করল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্রিয়তা থাকলে ওই মাদক আস্তানা আগেই উচ্ছেদ করা সম্ভব ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই দীর্ঘদিনের ঢিলেঢালা ভাব ও ব্যর্থতাই একজন জনপ্রতিনিধিকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার বা সস্তা পপুলিজমে উৎসাহিত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ঘটনাটির ভেতরে ইশরাক হোসেনের চরম রাজনৈতিক অপরিপক্বতাও ফুটে উঠেছে। একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের মূল কাজ নীতি নির্ধারণ করা, পুলিশ প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং আইন প্রণয়ন করা। অথচ তিনি নিজের পিআর টিম সঙ্গে নিয়ে ক্যামেরা সাজিয়ে স্টান্টবাজির মতো ভিডিও ধারণ করলেন এবং তা সগৌরবে ফেসবুকে প্রচার করলেন। নিজের ফেসবুক পেজে ভিডিও আপলোড করে সস্তা বাহবা কুড়ানোর এই সংস্কৃতি একধরনের প্রমোশনাল রাজনীতি বা ‘শো-অফ’ ছাড়া কিছু নয়। তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব না বুঝে কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার ভিউ বা লাইকের পেছনে দৌড়ায়, তবে তা সামগ্রিক রাজনীতির জন্য এক বড় বিপজ্জনক সংকেত।
রাজনৈতিক অপরিপক্বতা শুধু অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ঘটনার পর ইশরাকের প্রতিক্রিয়াতেও তা দেখা গেছে। ভুল স্বীকার বা সংযম দেখানোর বদলে তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে গণমাধ্যমকে ‘দালাল মিডিয়া’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ তোলেন যে সংবাদমাধ্যমগুলো মাদক কারবারিদের অর্থে পরিচালিত হয়ে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করছে। গঠনমূলক সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, গণমাধ্যমের ওপর দায় চাপানো এবং নিজের রাজনৈতিক পদের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারা স্পষ্টতই একধরনের অপরিপক্বতার লক্ষণ।
সামাজিক প্রতিরোধের নামে ভবিষ্যতে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন গড়ে তোলার যে ঘোষণা ইশরাক দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশাসনিক ও সামাজিক মহলেও শঙ্কা রয়েছে। পদত্যাগের পর তিনি ঢাকা-৬ আসনের জনগণকে নিয়ে সংগঠন বানিয়ে মাদক, চুরি ও চাঁদাবাজি ঠেকানোর কথা বলেছেন। প্রথম দর্শনে এটিকে নাগরিক উদ্যোগ মনে হলেও পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে কোনো অনানুষ্ঠানিক বাহিনী বা স্থানীয় কমিটি গড়ে উঠলে তা দিন শেষে পাড়া-মহল্লায় নতুন ধরনের ক্যাডার রাজনীতি বা দখলদারিত্বের জন্ম দিতে পারে। অপরাধ দমনের দায়িত্ব কোনো অনানুষ্ঠানিক দলের হাতে ছেড়ে দিলে রাষ্ট্রযন্ত্র আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সমাজের বিশৃঙ্খলা নতুন মাত্রা পায়।
তবে এ ঘটনায় সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান ছিল লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইশরাক হোসেনকে দ্রুত পদত্যাগের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, সরকার বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো বেপরোয়া আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি তরুণ রাজনীতিকদের জন্য সতর্কবার্তা যে, ক্ষমতার দাপট বা পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই থাক না কেন, সরকারের নীতি ও দেশের আইনি কাঠামোর ওপরে কেউ হতে পারে না।
পাশাপাশি এ ধরনের কর্মকাণ্ড বহির্বিশ্বে দেশের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মানুষকে ধাওয়া করার দৃশ্য যখন বিদেশি কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে, তখন তা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার পরিপক্বতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তোলে।
পরিশেষে ইশরাককাণ্ড আমাদের শাসনব্যবস্থার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মাদক নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে সেই লড়াই হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি নিয়মে। কোনো ব্যক্তির একক ‘বীরত্ব’ বা সাময়িক ‘শো-অফ’ কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসনকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা ও নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে উঠতে হবে, যেন সাধারণ মানুষকে বা জনপ্রতিনিধিদের আইন হাতে তুলে নিতে না হয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার সংযম শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি, কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী প্রদর্শনী নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে।
সাহিত্যকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি