গ্রাফিক : সময়ের আলোবিশ্বকাপ যখন সার বিশ্ব মাতিয়ে তোলে তখন স্বাভাবিকভাবে দুটি দেশের নাম বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হয়। একটি হচ্ছে আর্জেন্টিনা, অন্যটি হচ্ছে ব্রাজিল। ব্রাজিল মানেই হচ্ছে কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে, নেইমার, কাকা, রোনাল্ডোসহ আরও অনেকের নাম। যারা ব্রাজিলকে পৃথিবীর মানচিত্রে উদ্ভাসিত করেছে।
ব্রাজিলের ইতিহাস খুবই পুরোনো। ১৫০০ সালের আগে এই (ব্রাজিল) ভূখণ্ডে তূপী, গুয়ারানিসহ শত শত আদিবাসী উপজাতি বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ। সে সময় তাদের জীবনধারণ করতে হয় চাষ, শিকার ও মাছ ধরে।
১৫০০ সালের ২২ এপ্রিল পর্তুগিজ অভিযাত্রী পেদ্রো আলভারেস কাব্রাল ব্রাজিলের উপকূলে পৌঁছান। লাল রঙের মূল্যবান ব্রাজিল কাঠ থেকে দেশটির নাম হয় ব্রাজিল। পর্তুগিজরা বিশাল আখের বাগান গড়ে তোলে। কাজ করানোর জন্য আফ্রিকা থেকে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মানুষকে ধরে এনে দাস বানায়। আঠারো শতকে মিন্স জেরাইস অঞ্চলে স্বর্ণ ও হীরা আবিষ্কার হয়।
১৮২২ থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত নেপোলিয়নের ভয়ে পর্তুগিজ রাজপরিবার রিও ডি জেনোরিও চলে আসে। ১৮২২ সালে ৭ সেপ্টেম্বর রাজা ষষ্ঠ পুত্র ডম পেদ্রো ব্রাজিলকে স্বাধীন সামাজ্য ঘোষণা করেন। ১৮৮৮ সালে দাস প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সম্রাট পেদ্রো দ্বিতীয়কে হটিয়ে যুক্তরাষ্টীয় প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। ১৯৩০ সালে গেতুলিও ভার্গাস ক্ষমতা দখল করেন। এ সময় তিনি দেশের শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সামরিক একনায়কতন্ত্র অর্থাৎ ১৯৬৪ সাল থেকে মার্কিন সমর্থনে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ১৯৮৮ সালে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীকালে লুলা দ্য সিলভাসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে।
এখন প্রশ্ন আসে কে এই লুলা। যিনি চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন। লুলার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউন্স শহরে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। উন্নত জীবনের আশায় তার মা সন্তানদের নিয়ে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সাও পাওলোতে পাড়ি জমান। তখন লুলার বয়স মাত্র সাত বছর। পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নতুন জায়গায় বসতি গড়লেও অভাব তাদের পিছু ছাড়েনি।
ছোটবেলায় অর্থাৎ শৈশবেই সংসারের খরচ জোগাতে কাজ করতে হয়েছে লুলাকে। কখনো রাস্তায় চিনাবাদাম বিক্রি করেছেন, আবার কখনো কমলা বা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করেছেন। এমনকি কখনো জুতা পালিশ করতে হয়েছে। পরে অবশ্য কারখানায় কাজ নেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোয়নি তার। তবে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে ধাতব শিল্পে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। এক পর্যায়ে তিনি লেদ মেশিন পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করেন। এরপরই তিনি সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে ধাতব কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কারখানার কঠিন পরিবেশ, কম মজুরি আর শ্রমিকদের নানা সমস্যার অভিজ্ঞতা তাকে শ্রমিক আন্দোলনের দিকে টেনে নেয়। ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রামও তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। শ্রমিকদের প্রতিদিনের দুর্ভোগ তিনি কাছে থেকে দেখেছিলেন। এর ফলে শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর দাবি তার রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।
সত্তরের দশক লুলার রাজনৈতিক উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্রাজিল তখন সামরিক শাসনের অধীনে। এ সময় সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তিনি। ১৯৭৫ সালে সাও বার্নাদো দো কাম্পু ও দিয়াদেমার ধাতব শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদ তাকে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
সামরিক শাসনের শেষ দিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে বড় ধর্মঘট সংঘটিত করেন লুলা। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তার নেতৃত্বে শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের অংশগ্রহণে বড় ধরনের ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন তিনি। আন্দোলন দমনে কর্তৃপক্ষ ইউনিয়নের ওপর হস্তক্ষেপ করে। আর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় লুলাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে দমন-পীড়ন তার জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি। বরং শ্রমিকদের অধিকার ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক প্রতীক হিসেবে পরিচিতি বাড়ে। এ সময় ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও জোরালো হচ্ছিল।
১৯৮০ সালে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্কার্স পার্টি। অবশ্য তাদের ভাষায় পার্টির নাম দোস ত্রাবালহাদোরেস। দলটি শ্রমিকদের অধিকার, দারিদ্র্য কমানো, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লুলা দ্রুত জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ্য হয়ে ওঠেন।
১৯৮৬ সালে সাও পাওলো ফেডারেল ডেপুুটি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৯ সালে সামরিক শাসন পরবর্তী প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফার ভোটে ফার্নান্দো কোলর দে মেলোর কাছে হেরে যান। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও পরাজিত হন। তবে প্রতিটি নির্বাচনে তার পরিচিতি ও সমর্থনের ভিত্তি বিস্তৃত হতে থাকে।
পরপর তিনবার পরাজয়ের পর ২০০২ সালের নির্বাচনে কৌশল পরিবর্তন করেন লুলা। শ্রমিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেও অর্থনীতি ও বিনিয়োগের বিষয়ে তুলনামূলক মধ্যপন্থি বার্তা দেন। এতে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশের উদ্বেগ কমে। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে আসা একজন নেতার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ব্রাজিলের রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিলের পণ্য রফতানি বাড়ানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও তার সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
লুলার প্রথম দুই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক কর্মসূচির সম্প্রসারণের ফলে লাখো মানুষ দারিদ্র্য থেকে রেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। সরকার দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ও ব্রাজিলের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে টিকে থাকার বিষয়টি তার সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
২০০৬ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। ২০১০ সালে তার সমর্থিত প্রার্থী দিলন রুসেফ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দুই মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়লেও লুলার রাজনৈতিক প্রভাব অটুট ছিল। তবে তার দল ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তী সময়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে।
লুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে দুর্নীতির তদন্তের সময়। ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোবাসকে ঘিরে দুর্নীতি তদন্ত ও অপারেশন কার ওয়াশ নামে পরিচিত অভিযানের সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
২০১৭ সালে একটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরের বছরে কারাগারে যাওয়ায় ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। তার সমর্থকদের দাবি ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে বিরোধীরা অভিযোগ করেন, দুর্নীতির দায় এড়াতে তিনি রাজনৈতিক সমর্থন কাজে লাগাচ্ছেন।
২০১৯ সালে মুক্তি পান লুলা। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করেন। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, যে আদালত তার বিচার করেছিল, সেই আদালতের এ মামলার বিচার করার এখতিয়ার ছিল না। সংশ্লিষ্ট বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। এর ফলে লুলার রাজনৈতিক অধিকার ফিরে আসে। তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান।
২০২২ সালের নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। তীব্র মেরুকরণ ও উত্তেজনার মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় বলসোনারোকে হারিয়ে জয়ী হন লুলা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তার এ জয় সমর্থকরা গণতন্ত্র ও সামাজিক নীতির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখেন। ২০২৬ সালে আবারও নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। তার এই জয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।
নতুন মেয়াদে লুলার সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— দেশের ভেতরে জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনা, অপরাধ কমিয়ে আনা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা।
লুলার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বড় শক্তিগুলোর প্রভাবের বাইরে থেকে ব্রাজিলের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা। চলতি বছর এপ্রিলে স্পেনের এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কোনো দেশের নেতারই সকালে উঠে অন্য একটি দেশকে হুমকি দেওয়ার অধিকার নেই। সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নিজের নিয়মে চালাতে পারে, এমন ধারণা ভুল। তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। আবার ইসরাইলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন সেই সাক্ষাৎকারে।
বিদেশি পত্রিকায় লুলার সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে, জুতা পালিশ করা থেকে শুরু। শ্রমিকের সেই বলিষ্ঠ হাতে ব্রিকস নেশন গঠনের কাজ করেছেন। ডলারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছেন।
আমাজন রক্ষার এই হাত আজ কেবল লুলার ব্যক্তিগত সংগ্রামের প্রতীক নয়, এটি বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিসংবাদিত ইতিহাসের প্রতীক।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক সময়ের আলো
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে