প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১০ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলোজাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিল্পের বিকাশে দেশটির অনেক অবদান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬৩০ কোটি ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা আশাব্যঞ্জক। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এখন এই আলোচনা ও আশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় বাধা হলো জটিল নিয়মকানুন, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা এবং অর্থ স্থানান্তরে নানা সমস্যা। এসব বাধা দূর না হলে শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে লাভ হবে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সরকারি দফতরে হয়রানি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে জাপানের পাশাপাশি অন্য দেশের বিনিয়োগও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়। এর সুযোগ কাজে লাগাতে দেশের শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন রফতানি খাত গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তিতে সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের তরুণ কর্মশক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে উৎপাদন বাড়বে। দেশের মানুষের জন্য নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হবে। তবে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মীদের দক্ষ করে তোলার বিষয়টি ভুললে চলবে না।
জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। মেট্রোরেল, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য যোগাযোগ প্রকল্পও দেশের উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনে সহায়তা করবে। তবে বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে ব্যয়, সম্ভাব্য আয় ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিদেশি ঋণ ও অর্থায়নের শর্তও জনস্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সময়মতো কাজ শেষ করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রস্তাবও গুরুত্বের দাবি রাখে। জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠা করা গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ জন্য শুধু ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বাংলাদেশে শুধু পণ্য তৈরি করে নিয়ে না যায়, বরং প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তরেও ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে দেশের তরুণরা উন্নত কাজের সুযোগ পাবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম হবে।
একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত যৌথ কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বের শক্তি কেবল যৌথ ঘোষণায় নয়, বাস্তব অর্জনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারকে এখনই সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে