জেন-জি : রাষ্ট্রীয় অনিয়ম প্রতিরোধের প্রতীক

মো. নূর হামজা পিয়াস

মতামত

বিশ্বজুড়ে বৈষম্য, দুর্নীতি ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের নতুন ছাত্র আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সামাজিক

2026-10-30T05:11:02+00:00
2026-10-30T05:11:02+00:00
 
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
জেন-জি : রাষ্ট্রীয় অনিয়ম প্রতিরোধের প্রতীক
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিশ্বজুড়ে বৈষম্য, দুর্নীতি ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের নতুন ছাত্র আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নতুন জেন-জি প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় অনিয়ম ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ, কিংবা আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা সর্বত্রই প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে তরুণরা নিজেদের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে রাজপথে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত পরিবর্তন ও নতুন আশার সঞ্চার করছে।

ছাত্র ও জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঢেউ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সরকারগুলোকে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই অভূতপূর্ব গণসংহতি শ্রীলঙ্কা (২০২২), বাংলাদেশ (২০২৪) এবং নেপালে (২০২৫) সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন ও স্বৈরাচারী নেতৃত্বের পতনে নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকা রেখেছে, অন্যদিকে মাদাগাস্কারের তীব্র সামাজিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপে রূপ নেয়। বিশ্বজুড়ে প্রথাগত রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তরুণরা ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।

তরুণদের এই অসন্তোষ কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সার্বিয়া এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে বিশাল গণবিক্ষোভ দেখা গেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের বিক্ষোভগুলো মূলত সাংবিধানিক অধিকার, বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক নীতিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে। দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন হলেও প্রতিটি আন্দোলনের মূলে রয়েছে জবাবদিহিতাহীন শাসনব্যবস্থা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপেক্ষিত হয়ে আসছিল। প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ ও তার ক্ষমতাসীন দলের অধীনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব, বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ এবং নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একচেটিয়া দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিরোধীদের দমন এবং কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর তোষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের সার্বিক জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিনের শাসনে জমা হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এই ক্ষোভ ভেতরে ভেতরে এক বিরাট বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছিল।

সার্বিয়ার গণআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর নোভি সাদক রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিরপরাধ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর। দীর্ঘদিন ধরে পুনর্নির্মাণে দুর্নীতি, অস্বচ্ছ চীনা ঠিকাদারি চুক্তি এবং সরকারি তদারকির চরম অবহেলার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এমন অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। এর সঙ্গে পরিবেশবিধ্বংসী ‘রিও টিন্টো’ লিথিয়াম খনি প্রকল্প এবং নির্বাচনে জালিয়াতির ক্ষোভ যুক্ত হয়ে ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৫ সালজুড়ে বেলগ্রেডসহ সারা দেশে এক বিশাল ছাত্র-জনতার বিপ্লবে রূপ নেয়।

শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক দাবি ছিল নোভি সাদ ট্র্যাজেডির প্রকৃত তদন্ত, সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের পদত্যাগ এবং প্রকল্পের গোপন নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করা। তারা ‘দুর্নীতি হত্যা করে’ স্লোগান তুলে শহরের দেয়ালে দেয়ালে লাল রঙের রক্তমাখা হাতের প্রতীক এঁকে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে এই আন্দোলন কেবল একটি দুর্ঘটনার বিচারে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার বাজেট বৃদ্ধি এবং সার্বিয়ায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

ন্যায্য ও যুক্তিসংগত দাবি মানার বদলে রাষ্ট্রে বসে থাকা কায়েমি কর্তাব্যক্তিরা আন্দোলনকারী ছাত্র ও নাগরিকদের ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘বিদেশি এজেন্ট’ ও ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিতে শুরু করে। সরকারের নিয়ন্ত্রাধীন প্রচারমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের চরিত্রহনন করা হয় এবং আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলে। রাষ্ট্রীয় এই কুৎসা রটনা ও দমনমূলক মনোভাব শিক্ষার্থীদের নিরস্ত করার বদলে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষক, আইনজীবী এবং শ্রমিকদের আরও বেশি পরিমাণে রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য করে।

একনায়কতান্ত্রিক সরকার আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করতে পুলিশি টিয়ারগ্যাস, অন্যায় গ্রেফতার এবং সশস্ত্র দলীয় ক্যাডারদের রাজপথে লেলিয়ে দেয়। বেলগ্রেডের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিষিদ্ধ ধ্বনি-অস্ত্র বা ‘সাউন্ড ওয়েপন’ ব্যবহারের মতো চরম মানবতাবিরোধী অভিযোগও উঠে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় এই চরম হিংস্রতা ও শারীরিক নির্যাতন আন্দোলনের আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড অতিক্রম করে হাজার হাজার তরুণ বেলগ্রেডের রাজপথ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো অবরুদ্ধ করে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, সেতু এবং সরকারি ভবনগুলো টানা অবরুদ্ধ করার কর্মসূচি গ্রহণ করে। শিক্ষার্থীদের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশের শিক্ষক ইউনিয়ন, পরিবহন শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ পেশাজীবীরা একাত্মতা প্রকাশ করেন। টানা ১৫ মিনিটের নীরবতা পালনের মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ এবং কর্মবিরতির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম, যা ভুচিচ সরকারকে এক চরম নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলো যখন মিছিলে সাউন্ড ওয়েপন ব্যবহার, নির্বিচার গ্রেফতার ও শারীরিক নির্যাতন চালায়, তখন তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘের ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’-এর ধারা ১৯ ও ২০ এবং ‘আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ’-এর ২১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে প্রতিটি নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও স্বাধীন মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর টিয়ারগ্যাস বা ধ্বনি-অস্ত্রের অসংগত ও অন্যায্য ব্যবহার জাতিসংঘের ‘পুলিশ নীতি ও শক্তি প্রয়োগ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা’ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ধারা ১১-এর সরাসরি বরখেলাপ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন বা নির্বিচার বলপ্রয়োগ করতে পারে না।


সার্বিয়ার এই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের গভীর গঠনগত সাদৃশ্য রয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারি কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী ‘রাজাকার’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে দমন করতে চেয়েছিল। ঠিক সার্বিয়ার মতোই, দমনপীড়ন ও বুলেটের জবাবে ছাত্র-জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক দফা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভূদৃশ্যে নেপালও একই ধরনের তরুণ রাজনৈতিক জাগরণের সাক্ষী হয়েছে। ২০২৫ সালে নেপালের অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজনৈতিক নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সে দেশের জেন-জি প্রজা ও যুবসমাজ রাস্তায় নেমে আসে। পুরোনো ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর একচেটিয়া ক্ষমতার চক্র ভেঙে দিয়ে তরুণরা সরকার গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। এটি প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত জ্যেষ্ঠকেন্দ্রিক রাজনীতি এখন তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অধিকার চেতনার কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।

শিক্ষার্থী, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   জেন-জি  রাষ্ট্রীয় অনিয়ম  প্রতিরোধ  প্রতীক 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: