সরকারের মূল শক্তি : দলে সুদৃঢ় সাংগঠনিক পরিবর্তন

শায়রুল কবির খান

মতামত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থে সরকার পরিচালনার প্রশ্নে সরকার, ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কখনোই আলাদা তিনটি সত্তা নয়, বরং

2026-10-30T01:50:41+00:00
2026-10-30T01:51:59+00:00
 
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
সরকারের মূল শক্তি : দলে সুদৃঢ় সাংগঠনিক পরিবর্তন
শায়রুল কবির খান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫০ এএম  আপডেট: ৩০.১০.২০২৬ ১:৫১ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থে সরকার পরিচালনার প্রশ্নে সরকার, ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কখনোই আলাদা তিনটি সত্তা নয়, বরং একটি অভিন্ন বৃত্তের তিনটি বিন্দু। এই বৃত্ত যতটা দৃঢ় থাকে, রাষ্ট্র ততটাই স্থিতিশীল হয়। কিন্তু এই দৃঢ়তা এমনিতেই তৈরি হয় না, প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজের মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে বা ভেঙে পড়ে।

সরকারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাবমূর্তি, আর এই ভাবমূর্তি একদিনে তৈরি হয় না; মূলত সরকার পরিচালনায় সুশাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই তা গড়ে ওঠে। একটি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সদিচ্ছা যত ভালোই হোক না কেন, তার প্রতিফলন যদি মাঠপর্যায়ে না পৌঁছায়, তাহলে সেই সদিচ্ছার কোনো মূল্য থাকে না।

দীর্ঘ আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতনের পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র নেতৃত্বে এসেছে, তার একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। এই ম্যান্ডেট কেবল একটি নির্বাচনি বিজয় নয়, এটি এক ধরনের ঋণ—যে ঋণ শোধ করতে হবে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ ও সুশাসনের মাধ্যমে। জনগণ যখন পুরনো শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, তখন তাদের প্রত্যাশা ছিল একটাই, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং লাগামহীন দুর্নীতি বন্ধ হবে। এই প্রত্যাশাটা যদি কোনো কারণে নতুন করে ভাঙতে শুরু করে, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্যটা অনেক বড় হয়ে উঠবে। জনগণ ও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ভাঙনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে দলের ভেতরে ঢুকে পড়া কতিপয় ধান্দাবাজ ও সুযোগসন্ধানী চক্র। ওই চক্রটাই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করবে; তারা তা যেন ব্যবহার করতে না পারে, তার মূল দায়িত্বটা পালন করতে হবে দায়িত্বশীল নেতৃত্বকে।

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে যে ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছে, তার ধরনগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ক্ষমতার পালাবদলের পরে সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে অনিয়ম দেখা যায়। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্রবণতা একটি পুরনো সমস্যা; খাসজমি, হাটবাজারের ইজারা কিংবা নদীর তীরবর্তী সম্পত্তি বা বালু উত্তোলনসহ অনেক কিছু দখল করার প্রতিযোগিতা পুরনো সংস্কৃতি। 

তৃণমূল থেকে যেকোনো পর্যায়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের সুবিধা আদায় করার প্রবণতা মূলত দীর্ঘ সময়ের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। এই প্রবণতাকে বিরোধী মতাবলম্বী তকমা দিয়ে হেনস্তা করার চর্চা যেকোনো শাসনামলেই পুনরাবৃত্ত হতে দেখা যায়। এই প্যাটার্নগুলো চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য কাউকে অভিযুক্ত করা নয়, বরং এটা বোঝানো যে প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা না থাকলে ইতিহাস কীভাবে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী জায়গায় কোনো ঘাটতি থাকলেই সরকারি দলের কিছু মানুষের অসদাচরণের দায় সরকারকে বহন করতে হয়। প্রশাসনিক বাস্তবতায় সরকার আর ক্ষমতাসীন দল আলাদা করে দেখার সুযোগ জনগণের কাছে থাকে না। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যত ভালো সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের হাতে, তারাই যদি নিজেদের স্বার্থে সেই সেবা আটকে দেয় বা বিলম্বিত করে, তাহলে সাধারণ মানুষ সরকার ও দলীয় ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারে না; ফলে দায়টা এসে পড়ে সরাসরি সরকারের ঘাড়ে, যদিও প্রকৃত অপরাধ ঘটেছে একেবারে ভিন্ন স্তরে।

এই সমস্যার প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝা যায় যখন কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা হয়। একটি সরকারি সেবা কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বেরিয়ে জেলা, উপজেলা এবং সবশেষে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হয়। প্রতিটি ধাপে যদি কেউ না কেউ নিজের স্বার্থে সেই সেবাকে বিলম্বিত করে, শর্তযুক্ত করে বা বিনিময়ের বস্তুতে পরিণত করে, তাহলে শেষ প্রান্তে থাকা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয় দুইভাবে। প্রত্যক্ষভাবে সে তার প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, আর পরোক্ষভাবে সে এমন একটি সরকারের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, যে সরকার হয়তো প্রকৃতপক্ষে তার জন্যই কাজ করছিল।

এই জায়গাতেই সময় এসেছে কঠোর হওয়ার। শীর্ষ নেতৃত্বের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দলের ভেতরে থাকা এই ধরনের সুযোগসন্ধানীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। সাধারণ সতর্কবার্তা কিংবা মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়, কারণ ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া মানুষ সহজে সংযত হয় না। 

এখানে কয়েকটি দিক বিবেচনায় আনা যেতে পারে। প্রথমত, অভিযোগ শোনার জন্য একটি সরাসরি এবং দ্রুত মাধ্যম প্রয়োজন, যেখানে দলীয় পরিচয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র মনিটরিং সেল গঠন করলে অভিযোগ শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়ভাবে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়। 

দ্বিতীয়ত, দলীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দলীয় পদ বা পরিচয় সুরক্ষা পাবে না; প্রতীকী উদাহরণ তৈরি করা জরুরি, কারণ একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ শত বিবৃতির চেয়ে বেশি কার্যকর বার্তা দেয়। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আরও কার্যকর হবে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত স্বাধীনতার ব্যবস্থা করা। এতে করে তারা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইন প্রয়োগ করতে পারবেন; প্রশাসনের রাজনীতিকরণ যত বেশি হয়, জবাবদিহিতা তত কমে যায়। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সমালোচনাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে সংশোধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই নেতৃত্বের বিচক্ষণতা। যত দ্রুত এই বার্তাগুলো স্পষ্ট হবে, তত দ্রুত মাঠপর্যায়ে শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলা মজবুত হবে।

সরকারের আত্মরক্ষার কৌশল সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক হয় নিজের দলের ভেতরের অনিয়ম নিজেই আগে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে এবং বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের হাতে সুযোগ তুলে না দেওয়ার মধ্যে। তবে এই দায়িত্বে দেরি হলে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইতোমধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের কাছে সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়। জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করেই রাজনীতিতে ফেরার পথ প্রশস্ত হয় এবং সেই পথ তৈরি হতে দেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত নিজেদের ওপরই বর্তায়। তবে এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি; কঠোরতা কেবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, নিজের জায়গায় অনিয়মের বিরুদ্ধেও সমানে সমান প্রযোজ্য হবে। দ্বৈত মানদণ্ড জনগণের চোখে সবচেয়ে দ্রুত ধরা পড়ে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

তাই সময় এসেছে স্পষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্তের। যারা দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত মুনাফার হাতিয়ার বানাতে চায় এবং প্রশাসনিক সেবাকে বিনিময়ের পণ্যে পরিণত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে শীর্ষ নেতৃত্বের ন্যায়পরায়ণ ও কঠোর অবস্থান নেওয়াটাই সরকারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষার প্রশ্ন। সরকার যতই ভালো নীতি প্রণয়ন করুক, যতই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করুক, দলের ভেতরের কিছু মানুষের লোভ যদি সেই আন্তরিকতাকে ম্লান করে দেয়, তাহলে জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি হারিয়ে যায়। তাই তা হতে দেওয়া যাবে না; বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘোষিত '৩১ দফা'র ভিত্তিতে আগামী দিনের কল্যাণমুখী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।

সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   সরকার  শক্তি  দল  সাংগঠনিক পরিবর্তন 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: