ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
গ্রাফিক : সময়ের আলো দেশে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুতে প্রতিদিন প্রাণহানির ঘটনা পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত করছে।
হামের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো— উচ্চমাত্রার জ্বর, শুকনো কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও আলো সহ্য করতে অসুবিধা, মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ দেখা দেওয়া, মুখ ও মাথার দিক থেকে শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া, ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা ও অবসাদ, শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা।
হামের ক্ষেত্রে আলাদা ভাইরাসভিত্তিক সাধারণ কয়েকটি প্রকার প্রচলিত নেই। তবে রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হাম এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। আবার রোগের তীব্রতা ও জটিলতার ভিত্তিতে সাধারণ হাম এবং জটিলতাসহ হাম হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
শুধু ফুসকুড়ি বা জ্বর দেখে হাম নিশ্চিত করা উচিত নয়। অন্য ভাইরাসজনিত রোগেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক। এ রোগে নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ, খিঁচুনি, দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম ব্যক্তিদের জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
শিশুর শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, খিঁচুনি, পানি পান করতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা অচেতনতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। হামে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো— হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র মাথা ব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর, হাড়, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও বমি, ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত। ডেঙ্গুকে সাধারণভাবে তিনটি ক্লিনিক্যাল শ্রেণিতে বিবেচনা করা হয়— সতর্ক সংকেতবিহীন ডেঙ্গু, সতর্ক সংকেতযুক্ত ডেঙ্গু এবং গুরুতর ডেঙ্গু। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও জটিলতার লক্ষণ অনুসারে চিকিৎসক ঝুঁকি নির্ধারণ করেন।
তীব্র পেট ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, রক্তবমি, কালো পায়খানা, অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা নিস্তেজতা, শ্বাসকষ্ট এবং হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া গুরুতর অবস্থার সংকেত হতে পারে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাই জ্বর নেমে গেলেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন— এমন ধারণা করা যাবে না। গুরুতর ডেঙ্গুতে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে গিয়ে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে ডেঙ্গু শক, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গুরুতর অবস্থায় যকৃৎ, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও মস্তিষ্ক আক্রান্ত হতে পারে।
শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তবে যেকোনো বয়সের মানুষের গুরুতর ডেঙ্গু হতে পারে।
রোগীকে নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানো বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও অন্যান্য অনুরূপ ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।
হাম ও ডেঙ্গুর লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি হলেও রোগ দুটির কারণ ও পরীক্ষা পদ্ধতি আলাদা।
হাম নির্ণয় : রোগীর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং ফুসকুড়ির ধরন ও সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শের ইতিহাস বিবেচনা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি পরীক্ষা এবং নাক-গলার নমুনায় ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্তের পরীক্ষা করা হতে পারে।
ডেঙ্গু নির্ণয় : অসুস্থতার কততম দিনে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার ওপর পরীক্ষার ধরন নির্ভর করে। জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে ডেঙ্গুর এনএস১ অ্যান্টিজেন বা আরটি-পিসিআর পরীক্ষা উপযোগী হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে পূর্ণ রক্তগণনা, হেমাটোক্রিট ও প্লাটিলেটের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গুর তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তপাত, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং অন্যান্য শারীরিক লক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসক ধারাবাহিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন।
হাম ও ডেঙ্গু— দুটির ক্ষেত্রেই বাড়িতে সহায়ক যত্ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘরোয়া যত্ন কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় হাসপাতাল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
হামে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। দুধ খাওয়া শিশুকে বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে। বয়স উপযোগী তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর নিয়ন্ত্রণ এবং ভিটামিন ‘এ’ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘর পরিষ্কার ও বায়ু চলাচল উপযোগী রাখতে হবে এবং অন্যদের সংক্রমণ থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঘরে অপেক্ষা না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি, খাবার স্যালাইন ও অন্যান্য উপযুক্ত তরল দিতে হবে। অল্প অল্প করে বারবার তরল গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। প্রস্রাবের পরিমাণ, বমি, রক্তপাত, পেট ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী জ্বরের ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড, অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা যাবে না। গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। রোগীকে জোর করে অতিরিক্ত তরল পান করানোও ঠিক নয়। বিশেষ করে কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির তরলের পরিমাণ চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স অনুযায়ী জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরামর্শ নিতে হবে। সংক্রমণ বাড়লে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে অপসারণ করতে হবে। পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে, ফুলের টব ও ফ্রিজের নিচের ট্রে পরিষ্কার করতে হবে এবং পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। মশারি, জানালার জালি, উপযুক্ত মশা প্রতিরোধক এবং শরীর ঢাকা পোশাক ব্যবহার করা যেতে পারে।
শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
হাম ও ডেঙ্গুর মতো রোগের বিস্তার মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় প্রশাসন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অক্সিজেন, শয্যা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
একই সঙ্গে রোগের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্তকরণ, টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতি পূরণ এবং মশার প্রজননস্থল নির্মূলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর চাপ বেড়ে গেলে হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রোগী বাছাই ও গুরুতর রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, আবার বিপদের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অবহেলা করা যাবে না।
হাম ও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবহেলার সুযোগ নেই। হামের ক্ষেত্রে টিকাদান, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই প্রধান করণীয়।
প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত সচেতনতা, দায়িত্বশীল আচরণ ও সময়োপযোগী চিকিৎসার মাধ্যমেই হাম ও ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী ঝুঁকি কমিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক : লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/ প্রিন্ট/কেএইচও