মো. নূর হামজা পিয়াস
গ্রাফিক : সময়ের আলো ফলাফলের এই পতন বৈষম্যমূলক শিক্ষা কাঠামোর করুণ দশাকে সামনে এনেছে। ঢাকা ও প্রধান শহরের নামিদামি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা কোনোমতে ফল ধরে রাখতে পারলেও, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজগুলোর অবস্থা ছিল চরম হতাশাজনক। মানসম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, লাইব্রেরি ও তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার শূন্যতা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সাম্প্রতিক ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগতমানের অবক্ষয়কে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে। বহু বছরের উচ্চ পাসের হারের পরিসংখ্যানের অন্তরালে যে লার্নিং গ্যাপ বা শিখন ঘাটতি জমে উঠেছিল, তা আজ এক ভয়াবহ চিত্র ধারণ করেছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম হতাশাজনক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মেধার প্রকৃত বিকাশ না ঘটিয়ে কেবল নম্বর দেওয়ার শিথিল মূল্যায়ন সংস্কৃতি যে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, সাম্প্রতিক ফল তার স্পষ্ট প্রমাণ।
এইচএসসি পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফলের সার্বিক পরিসংখ্যানে ২২ বছরের মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে কম। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫১.৬২ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৫৭.১২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় উচ্চ পাসের হার অর্জিত হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে এটি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২২ বছরের মধ্যে এমন বিপর্যয় প্রমাণ করে যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়নে কিছুটা নজরদারি বাড়তেই প্রকৃত মেধার আসল স্কেল বেরিয়ে এসেছে।
ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও এবার এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ২৭ হাজারের বেশি। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫,৯৪৮ জন পরীক্ষার্থী, যেখানে গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩,২১৯ জন। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭,২৭১ জন। একই সঙ্গে দেশের শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি এমন শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তুলেছে।
ফলাফল বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পাসের হার ও মেধার এই অভূতপূর্ব পতন সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায়। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ল্যাব সুবিধা ও তুলনামূলক ভালো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি পাওয়ায় অপেক্ষাকৃত ভালো ফল করলেও, মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকার মানবিক শাখার শিক্ষার্থীরা গণহারে অকৃতকার্য হয়েছে। এই চরম বৈষম্য প্রমাণ করে যে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের কলেজগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষক ও আধুনিক শিখন পদ্ধতির যে ভয়াবহ অভাব রয়েছে, তা দীর্ঘকাল ধরে অরক্ষিত রয়ে গেছে।
ফলাফলের এই ভয়াবহ ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ইংরেজি এবং গণিতের মতো বাধ্যতামূলক বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের গণহারে অকৃতকার্য হওয়া। শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু ইংরেজিতে খারাপ করার কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পুরো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ব্যাকরণ ও মৌলিক ইংরেজি দক্ষতার দুর্বল ভিত্তি নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিকে প্রবেশ করছে, যার মাশুল তাদের দিতে হচ্ছে এইচএসসির চূড়ান্ত পাবলিক পরীক্ষায় গিয়ে।
করোনাকালে এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় ‘অটো পাস’ প্রদান কিংবা উত্তরপত্র মূল্যায়নে অতিরিক্ত উদারতা প্রদর্শনের নীতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে। কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়িয়ে সাময়িক সাফল্য দেখানোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছিল। যখনই উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোর ও সঠিক স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োগ করা শুরু হলো, অমনি কৃত্রিম ফলাফলের বুদবুদ ফেটে গিয়ে শিক্ষার মূল কাঠামোর ভয়াবহ ও প্রকৃত সত্যটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হলো।
করোনাকালে দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষ বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের নানা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারাত্মক ‘লার্নিং গ্যাপ’ বা শিখন ঘাটতি তৈরি করেছে। সরাসরি ক্লাসে না গিয়ে অনলাইন শিক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের চরম পিছিয়ে দিয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক পাঠদানের ঘাটতি এবং পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মানসিক প্রভাব শিক্ষার্থীদের নিয়মানুগ অধ্যবসায়ের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল, যা এই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
ফলাফলের এই পতন বৈষম্যমূলক শিক্ষা কাঠামোর করুণ দশাকে সামনে এনেছে। ঢাকা ও প্রধান শহরের নামিদামি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা কোনোমতে ফল ধরে রাখতে পারলেও, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজগুলোর অবস্থা ছিল চরম হতাশাজনক। মানসম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, লাইব্রেরি ও তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার শূন্যতা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। শিক্ষাব্যবস্থার এই আঞ্চলিক বৈষম্য দেশের সুষম মেধা বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
ফলাফল বিপর্যয় কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয় বরং এটি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষা ভাবনার ওপরও বড় প্রশ্ন তোলে। মূল পাঠ্যবই পড়ার অভ্যাস ছেড়ে দিয়ে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের শিট ও মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রকৃত শিখন মান তদারকি না করে কেবল কাঙ্ক্ষিত নম্বর অর্জনের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। শ্রেণিকক্ষের মূল পড়াশোনা থেকে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্নতা এবং কোচিং নির্ভরতা তাদের মৌলিক চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
পরীক্ষার উত্তরপত্র সঠিকভাবে ও মানসম্মতভাবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বহু বছর ধরে খাতা মূল্যায়নে নির্দিষ্ট কোনো কঠোর নীতিমালা না থাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষক ভিন্নভাবে নম্বর প্রদান করতেন। সঠিক ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এবার কিছুটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাবলি প্রদান করায় পাসের হার হ্রাস পেয়েছে। শিক্ষকদের জন্য বিশ্বমানের সাবজেক্টভিত্তিক প্রশিক্ষণ না থাকলে সঠিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এইচএসসিতে পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশে নেমে আসা এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ার ফলে উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি খাতের সমীকরণে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটবে। যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্টসংখ্যক আসনের জন্য ভর্তি পরীক্ষা হয়, তবে বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া দেশের সার্বিক উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে সংকুচিত করবে। এর ফলে বহু শিক্ষার্থী মানসিক অবসাদে পড়বে এবং উচ্চশিক্ষায় ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর চরম পতনের পাশাপাশি কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেখানেও পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর ওপর নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় ব্যবহারিক দক্ষতার মান নিশ্চিত না করেই সনদ দেওয়ার পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকলে শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে না। সব বোর্ডের শিক্ষার মানকে এক সূত্রে গাঁথা না গেলে জাতীয় মেধার সমতা রক্ষা করা কঠিন হবে।
ফলাফল প্রকাশের পর শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডগুলোতে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে পুনর্নিরীক্ষণে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর ফল ও গ্রেড পরিবর্তনের ঘটনা শিক্ষা বোর্ডের ডাটা প্রসেসিং ও পরীক্ষকদের চরম গাফিলতিকে প্রকাশ করেছিল। খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকদের কোনো বড় ভুল বা ত্রুটি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং সার্বিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
এইচএসসি স্তরের এই বিপর্যয়ের বীজ মূলত রোপিত হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাবোঝার দুর্বল ভিতে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে মুখস্থনির্ভর পাবলিক পরীক্ষা চালু রাখা এবং মূল বিষয় না বুঝিয়ে পরবর্তী ক্লাসে তুলে দেওয়ার নীতিই উচ্চ মাধ্যমিকে এসে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার মূল কারণ। যদি প্রাথমিক স্তরেই ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা স্পষ্ট না করা হয়, তবে কেবল উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এসে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা করা এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা মাত্র।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের হার জিডিপির তুলনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক নিচে রাখা আমাদের শিক্ষা ধ্বংসের অন্যতম কারণ। নামকাওয়াস্তে কলেজ ভবন তৈরি করলেই শিক্ষার মান বাড়ে না বরং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, সম্মানজনক বেতন কাঠামো, আধুনিক ল্যাব ও ডিজিটাল ক্লাসরুম তৈরিতে অর্থ ব্যয় করতে হবে। শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক বিবেচনা মুক্ত রেখে গবেষণাধর্মী ও মানসম্মত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ না বাড়ালে শিক্ষার পতন থামানো সম্ভব হবে না।
ঘনঘন কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন না করে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিশনের মূল কাজ হবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত থেকে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য একটি টেকসই ও আধুনিক শিক্ষানীতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন করা। নিরপেক্ষ শিক্ষা প্রশাসন গঠন করতে না পারলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে