মো. তাহমিদ রহমান
ছবি : সংগৃহীত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তরণের পর অর্জিত উন্নয়নও ঝুঁকির মুখে পড়বে। আবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও নিশ্চিত করা কঠিন হবে। জাতিসংঘের দেওয়া তিন বছরের বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এলডিসি উত্তরণকে শুধু আন্তর্জাতিক মর্যাদা পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় যাদের সবচেয়ে কম, তাদেরই মূল্য দিতে হচ্ছে বেশি। বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন এই বৈশ্বিক অবিচারের এক জীবন্ত দলিল। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের দায় আধা শতাংশেরও কম, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপন্ন দেশগুলোর তালিকায় আমাদের অবস্থান সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও খরার সম্মিলিত আঘাতে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। অথচ এই সংকট মোকাবিলায় যে বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তা এখনও প্রতিশ্রুতির তুলনায় অপ্রতুল। প্রশ্ন উঠছে প্রতিশ্রুতির এই ফাঁদে আর কতদিন?
এই বাস্তবতায় ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলন কপ-৩১। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার আরেকটি পর্ব নয়; বরং ন্যায্য অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিকে জোরালো করার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
এর ঠিক আগে ২৯ অক্টোবর ২০২৬, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত মাইলফলকে পৌঁছাবে। এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ। কারণ দীর্ঘ উন্নয়নযাত্রার স্বীকৃতি হিসেবে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করলেও দেশের অর্থনীতি, রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সামনে এখনও বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
এই তিন বছরের অবকাশকে তাই কেবল উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ার সময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হতে পারে অর্থনৈতিক সংস্কার, রফতানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য সুবিধা সংরক্ষণ, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কার্যকর প্রস্তুতিকাল। একই সঙ্গে কপ-৩১ বাংলাদেশের জন্য এই নতুন বাস্তবতায় জলবায়ু কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি তিন বছরে বাংলাদেশ কী করতে চায়? উত্তরণের প্রস্তুতি কি কেবল বাণিজ্যিক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও উন্নয়নগত বৈষম্য মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে? কপ-৩১ এবং এলডিসি উত্তরণের বর্ধিত প্রস্তুতিকাল বাংলাদেশের সামনে এই দুটি বিষয়কে একসূত্রে গাথার সুযোগ এনে দিয়েছে। কপ-৩১-এর আয়োজকরা সম্মেলনকে বলছেন বাস্তবায়নের সম্মেলন।
উপকূলের কৃষক জমিতে লবণাক্ততার কারণে ফসল ফলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, নদীতীরের পরিবারগুলো বারবার ভিটেমাটি হারাচ্ছে, শহরের নিম্নআয়ের মানুষ তীব্র তাপপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবন প্রতিটি ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় উজানের পানিপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব দেশকে বিপন্ন করছে।
জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের তারতম্য থাকলেও মূল বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সীমিত হলেও জলবায়ুজনিত ক্ষতির বোঝা আমাদের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বড়। এই বৈপরীত্যই জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তি হওয়া দরকার। যারা ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে শিল্পায়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, বিপন্ন দেশগুলোর মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় তাদের দায়িত্বও বেশি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়নের বার্ষিক প্রয়োজন ২৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে উল্লেখ করেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউএনডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে বাংলাদেশের বার্ষিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজন ২৬ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
অর্থাৎ বছরে গড়ে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রাপ্তি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় নদীভাঙন, উপকূলীয় ক্ষয়, বন্যা, লবণাক্ততা, জলবায়ু-অভিবাসন, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামোসহ বহু খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণ আর বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
এই ব্যবধান পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থায়নের শর্ত সহজ করা জরুরি। জলবায়ু অর্থায়নের বড় উদ্বেগ হলো ঋণনির্ভরতা। বাংলাদেশেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই ঋণ। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও সংকট মোকাবিলায় ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
আসন্ন কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হওয়া উচিত জলবায়ু অর্থায়নের নিশ্চয়তা। বছরের পর বছর ধরে উন্নত দেশগুলো জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ, তা ছাড়ের সময়সীমা, অর্থায়নের শর্ত এবং প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশকে নিজস্ব উন্নয়ন বাজেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কপ-৩১-এ বাংলাদেশকে তাই জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থপ্রবাহে রূপান্তরের দাবি জানাতে হবে। কোন দেশ কত অর্থ দেবে, কোন খাতে অর্থ ব্যয় হবে, কীভাবে তা ছাড় করা হবে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন উপকূলীয় বাঁধের উন্নয়ন, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, লবণসহিষ্ণু কৃষি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং জলবায়ুসহিষ্ণু নগর অবকাঠামো। বাংলাদেশের কূটনীতিকে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে, জলবায়ু অর্থায়ন কোনো দাতব্য অনুগ্রহ নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। এলডিসি উত্তরণের বর্ধিত প্রস্তুতিকালকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জলবায়ু কূটনীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং অর্থনৈতিক রূপান্তর ও জলবায়ু সহনশীলতাকে একই উন্নয়ন কৌশলের অংশ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আরেকটি শক্তি হতে পারে জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে ঐক্য। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র এবং অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ অর্থায়ন, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্নে বৃহত্তর সমর্থন গড়ে তুলতে পারে। একক দেশের কণ্ঠের তুলনায় ঐক্যবদ্ধ দাবির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত, অন্যদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি।
এই দুটি চ্যালেঞ্জকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তরণের পর অর্জিত উন্নয়নও ঝুঁকির মুখে পড়বে। আবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
জাতিসংঘের দেওয়া তিন বছরের বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এলডিসি উত্তরণকে শুধু আন্তর্জাতিক মর্যাদা পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। আন্তালিয়ায় কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর যদি এই বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তা হলে আগামী তিন বছরের প্রস্তুতিকাল জলবায়ু ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা হতে হবে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ তৈরি না করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধানের পথ দেখানো।
এই কূটনীতির সাফল্য মাপা হবে কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কতগুলো প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল, কিংবা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, তার ভিত্তিতে নয়। বরং উপকূলের বিপন্ন মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হলো, কৃষক ও শ্রমিক কতটা সুরক্ষা পেলেন, রফতানি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ কতটা তৈরি হলো এবং জলবায়ু সহায়তা বাস্তবে দেশের মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাল, তার ভিত্তিতে।
লেখক : শিক্ষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে