পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা

রেজাউল করিম খোকন

মতামত

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে এ শিল্প বড় ভূমিকা রাখছে।

2026-11-03T05:23:44+00:00
2026-11-03T05:23:44+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:২৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে এ শিল্প বড় ভূমিকা রাখছে। লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। ফলে পোশাক শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মালিক বা শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। কয়েক দিন ধরে মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকটি কারখানা ও মার্কেটে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। 

পরিস্থিতি সামাল দিতে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়েছে। সীমিত আয়ে সংসার চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সরকারেরও দায়িত্ব শ্রমিকদের জীবনমান ও শিল্পের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো তৈরি করা।

ইতিমধ্যে সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে বোর্ডের সদস্য মনোনয়নের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়েও মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা বকেয়া পাওনা পরিশোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। অর্থাৎ শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। এখন প্রয়োজন আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও বিভিন্ন এলাকায় কেন শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে? শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বকেয়া বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা এর কারণ হতে পারে। পাশাপাশি কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এই অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি এবং বাইরে থেকে উসকানি দেওয়ার ঘটনা থাকলে তা আলাদা করে শনাক্ত করতে হবে। তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। 

একইভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আড়ালে কেউ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টা করলে সেটিও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক কোনো কোনো মহল দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। গত ১৬ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে দেশে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই শাসনের অবসান ঘটেছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ সময়ে কোনো পক্ষ যদি শ্রমিক অসন্তোষকে ব্যবহার করে শিল্প ও অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে, তবে তা অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা দরকার।

তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কে শ্রমিক, কে বহিরাগত এবং কারা আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে, তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যাবে না। সাংবাদিকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলনস্থল সরেজমিন পরিদর্শন, শ্রমিকদের বক্তব্য, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য যাচাই করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত নয়।

পোশাক শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষের উদ্বেগও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের চুক্তি থাকে। কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে ক্রেতাদের আস্থা কমতে পারে। এতে রফতানি আয় ও কারখানার আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিল্পের উৎপাদন সচল রাখা মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের স্বার্থেই জরুরি। তবে উৎপাদন সচল রাখার অজুহাতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা যাবে না। 

মালিকদেরও বুঝতে হবে, শ্রমিকের জীবনমান উন্নত না হলে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে পোশাক শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গ্রাম থেকে আসা অসংখ্য নারী-পুরুষের জীবনে অর্থনৈতিক পরিবর্তন এনেছে এ খাত। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এর অবদান বড়। এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রমিকরা কর্মহীন হবেন, রফতানি আয় কমবে এবং দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। তাই কোনো পক্ষের দায়িত্বহীন আচরণ বা স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিল। তারা চেয়েছিল সহনশীলতা, জবাবদিহিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে উঠবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এখনও রয়ে গেছে। সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। 


সরকারের কাজের সমালোচনা করার অধিকারও বিরোধী দলের রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের কারণে জাতীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কারও কাম্য হতে পারে না।

এ মুহূর্তে শ্রমিক, মালিক, সরকার এবং রাজনৈতিক দল— সবারই দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। সরকারকে দ্রুত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শেষ করে শ্রমিকদের জন্য গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কারখানাগুলোতে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। অন্যদিকে শ্রমিকদেরও শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে হবে। সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। মালিকদের উচিত শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে আন্তরিক হওয়া।

যারা শ্রমিকদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কারখানা ধ্বংস, উৎপাদন বন্ধ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের নামে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যাবে না। প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার এবং শিল্পের নিরাপত্তা, দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক শিল্প রক্ষা করা শুধু মালিকদের দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়। এ শিল্পের সঙ্গে শ্রমিকদের জীবন, দেশের রফতানি আয় এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ এবং শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ যেন এই শিল্পকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জাতীয় অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে রক্ষা করতে হলে সংঘাত নয়, প্রয়োজন সংলাপ, সমঝোতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ।

সাবেক ব্যাংকার
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   পোশাক শিল্প  অস্থিতিশীল  অপচেষ্টা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: