গ্রাফিক : সময়ের আলো এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এবার উচ্চ মাধ্যমিকে ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে (আইসিটি) ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। এই দুটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
সর্বশেষ ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামন্ত্রী একটি নতুন সুযোগের কথা জানিয়েছেন। যারা এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের এক থেকে দুই মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে শিক্ষার্থীদের সময় ও মানসিক চাপ কমবে। অভিভাবকদের ওপর থেকেও চাপ কিছুটা কমবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ পরীক্ষায় নিবন্ধিত ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। তবে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ৮ আগস্ট পরীক্ষা শেষ হয়। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই বোর্ডের পরীক্ষা ৯ সেপ্টেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হয়।
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। অর্থাৎ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এবার ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি।
শুধু এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৩৪৮ জন। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন শিক্ষার্থী। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। সেখানে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি বিএম-ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৮৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৬১০ জন।
গত ৩৬ বছরের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাসের হারে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। কোনো বছর পাসের হার ২৫ শতাংশের নিচে নেমেছে, আবার কোনো বছর তা ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ২০২০ সালে করোনার কারণে পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়নের মাধ্যমে সব পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে পাসের হার হয়েছিল ১০০ শতাংশ। তবে স্বাভাবিক পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে এ বছরের ফলাফল তুলনা করা ঠিক হবে না।
পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠ্যসূচি শেষ করার সুযোগ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি— সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলে। শুধু পাসের হারের পরিসংখ্যান দিয়ে কোন বিষয়টি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে মূল্যায়নব্যবস্থায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে এবং শিক্ষার মানের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে— এটি আমাদের কিছুটা আশাবাদী করে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার প্রশ্নপত্র তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। প্রশ্ন তৈরি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। এতদিন জ্ঞানার্জনের চেয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সেই প্রবণতা থেকে মূল্যায়নব্যবস্থা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। এটি অবশ্যই ভালো দিক।
১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ১৯৯৬ সালে, ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে করোনাকালে পরীক্ষা ছাড়াই শতভাগ শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। এ ধরনের বড় পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
বিভিন্ন কারণে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ওঠানামা হতে পারে। গত দুই বছরে নীতিমালার পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তবে এবারের ফলাফলে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার পেছনে দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। তারা পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, সেটি জানার চেষ্টা করে বেশি।
বাজারের নোট, সাজেশন, প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। ফলে ভাষা শেখার প্রকৃত চর্চা হয় না। ব্যাকরণের কিছু নিয়ম মুখস্থ করা, শূন্যস্থান পূরণ কিংবা অন্যের লেখা অনুসরণ করে উত্তর দেওয়ার মধ্যেই তাদের প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ থাকে।
ইংরেজি বিষয়ে লেখার দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত অনুশীলন প্রয়োজন। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী নিজে থেকে অনুচ্ছেদ, চিঠি বা আবেদনপত্র লেখার চর্চা করেন না। তারা আগের বছরের প্রশ্ন ও সম্ভাব্য সাজেশনের ওপর নির্ভর করেন। এতে পরীক্ষায় কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হলেও ইংরেজি ভাষার মৌলিক দক্ষতা তৈরি হয় না।
অন্যদিকে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অনেক শিক্ষার্থীর কাছেও ইংরেজি একটি কঠিন বিষয়। তাদের মধ্যে ভাষা ও ব্যাকরণের মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। অনেকেই না বুঝে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। ফলে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে না। নিয়মিত ইংরেজি ক্লাস করা, পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায়গুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং অনুশীলনের মাধ্যমে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আইসিটি বিষয়েও শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তা সত্ত্বেও পাঠ্যবই ও সহায়ক বইয়ের সাহায্যে বিষয়টির মৌলিক ধারণা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনীহা ও অনিয়মিত পড়াশোনাও এ ক্ষেত্রে বড় কারণ হতে পারে। কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ বিষয়ে অকৃতকার্য হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা করা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। এবার ঢাকা শিক্ষা বোর্ড পাসের হারে শীর্ষে থাকলেও বরিশাল বোর্ড রয়েছে সবার নিচে। কিন্তু আগামী বছর হয়তো বরিশাল বোর্ডই শীর্ষে চলে আসবে। এভাবে বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফলে বড় ধরনের ওঠানামা কেন হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের তেমন আলোচনা বা গবেষণা নেই। অথচ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন বোর্ডের শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছেন, শিক্ষকদের দক্ষতা, পাঠদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা কিংবা মূল্যায়নব্যবস্থার কোন ঘাটতি এর পেছনে কাজ করছে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
সবশেষে যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই, তা হলো ইংরেজি ও আইসিটিতে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা। বিশ্বায়নের এই যুগে শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই পড়াশোনা করুন না কেন, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
অথচ উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। এটি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের বিষয় নয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। এই সংকেতের অর্থ বুঝতে হবে।
শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কোথায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি কী এবং পাঠদান পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন— তা চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি