কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়

মতামত

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়া যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য বিরল সুযোগ। উৎপাদন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে এই জনমিতিক সুবিধাকে সমৃদ্ধিতে রূপ

2026-11-05T06:29:29+00:00
2026-11-05T06:29:29+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬,
২১ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
প্রস্তুতির অভাবে সম্ভাবনা বোঝায় পরিণত হতে পারে
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:২৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়া যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য বিরল সুযোগ। উৎপাদন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে এই জনমিতিক সুবিধাকে সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়ার কথা। বাংলাদেশও সেই সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে সুযোগটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না; বরং বাড়ছে উদ্বেগ, ভবিষ্যতে এই বিপুল জনগোষ্ঠীই বেকারত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার চাপ বাড়াবে কি না।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর কমতে থাকবে কর্মক্ষম মানুষের ভাগ, আর বাড়বে প্রবীণের সংখ্যা। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর হাতে সময় আছে প্রায় দুই দশক। এই সময়টুকু কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতে নির্ভরশীল মানুষের ভার বহন কঠিন হবে।

শ্রমবাজারের বর্তমান চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত— যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, নির্ধারিত মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা সাধারণত নেই। স্নাতকদের বড় অংশও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কেউ অনানুষ্ঠানিক পেশায় কাজ করছেন, কেউ শিক্ষার সঙ্গে অসংগত কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এসব খাতে আয় আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ— উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর গড়ের অর্ধেক।

এই ব্যবধানের সমাধান শুধু আরও চাকরি তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; প্রয়োজন উৎপাদনশীল ও নিরাপদ কাজ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চেয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে না। তাদের উপযোগী দক্ষতা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।


এ জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। প্রাক‌-প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের ভর্তির হার দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক কম। কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণকে বাস্তব কাজের সঙ্গে মিলিয়ে সাজাতে হবে, পাশাপাশি তরুণদের জন্য শিক্ষানবিশি ও প্রথম চাকরিতে প্রবেশের পথ তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা এবং ব্যবসার নিয়মকানুন সরল করাও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা দূর করাও অপরিহার্য। নিরাপদ যাতায়াত, শিশুযত্নের ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং হয়রানি প্রতিরোধ— এসব নিশ্চিত না হলে দেশের বড় একটি সম্ভাবনাময় কর্মশক্তি কাজে লাগবে না। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমাতে হবে। গ্রামের মানুষের তুলনায় শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব ১৮ গুণ বেশি— সুস্থ ও উৎপাদনশীল কর্মশক্তি গড়ার জন্য এ বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য।

আরেকটি জরুরি প্রস্তুতি প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা। ২০৫১ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি হতে পারে। অথচ মাসে ৫০০ টাকার বয়স্ক-ভাতা দিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষা জাল গড়ে তুলতে হবে।

সময় সীমিত, কিন্তু সুযোগ এখনও আছে। কর্মসংস্থান, দক্ষতা, নারী অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা— প্রতিটি ক্ষেত্রে এখনই ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের জনমিতিক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হবে, আর আজকের সম্ভাবনা কালকের বোঝায় পরিণত হবে।  এ থেকে উত্তরণের পথ এখনই বের করতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেমন কল্যাণকর তেমনি সঠিক দক্ষতায় গড়ে তুলতে না পারলে সামনের দিনগুলোর জন্য অর্থনীতিতে বড় শঙ্কা সৃষ্টি করবে। বিষয়টি   গুরুত্বসহকারে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে করে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়— এটাই প্রত্যাশা।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: