ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা

ডা. শাহজাদা সেলিম

মতামত

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু এ রোগ নিয়ে ভুল ধারণা, সামাজিক কুসংস্কার এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অসম্পূর্ণ

2026-11-04T03:16:37+00:00
2026-11-04T03:16:37+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
ডা. শাহজাদা সেলিম
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:১৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু এ রোগ নিয়ে ভুল ধারণা, সামাজিক কুসংস্কার এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে অনেকেই সময়মতো পরীক্ষা করান না, চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন কিংবা নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করে দেন। বিশেষ করে খাবার, ইনসুলিন, ভেষজ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এসব ভুল ধারণা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

শুধু মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয় ভুল। বংশগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অন্যান্য বিপাকীয় কারণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় ওজন বাড়াতে পারে, তবে শুধু মিষ্টি খাওয়াই ডায়াবেটিসের একমাত্র কারণ নয়।

রোগা মানুষের ডায়াবেটিস হয় না ভুল। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক ওজন থাকা সত্ত্বেও টাইপ ২ ডায়াবেটিস হতে পারে। তাই শুধু শরীরের গড়ন দেখে ঝুঁকি বিচার করা ঠিক নয়। ডায়াবেটিস হলে ভাত সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে ভুল। ভাত বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি, মাছ, ডিম বা ডালের মতো প্রোটিন খাওয়া যায়। মোট শর্করা গ্রহণের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

আম, কাঁঠাল, কলা ও লিচু ডায়াবেটিস রোগীর জন্য নিষিদ্ধ ভুল। এসব ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যায়। ফলের পরিমাণ ও ব্যক্তির রক্তের শর্করার প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করতে হবে। ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল খাওয়া ভালো। গুড়, মধু ও খেজুরের রস চিনির চেয়ে নিরাপদ ভুল। এগুলোও রক্তের শর্করা বাড়াতে পারে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে এলেই কনো মিষ্টি উপাদান ডায়াবেটিসের জন্য নিরাপদ হয়ে যায় না। করলা, মেথি বা দারুচিনি খেলেই ডায়াবেটিস সেরে যায় এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এসব উপাদানের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বন্ধ করা বিপজ্জনক।

ডায়াবেটিস হলে সব ওষুধ সারাজীবন একই মাত্রায় খেতে হয় ভুল। রক্তের শর্করা, কিডনির কার্যক্ষমতা, ওজন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ পরিবর্তন করতে পারেন। তবে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা কমানো উচিত নয়।
ইনসুলিন নিলে কিডনি নষ্ট হয় ভুল। ইনসুলিন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসই কিডনির ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইনসুলিন প্রয়োজন হলে ভয় পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।

ইনসুলিন শুরু মানেই রোগের শেষ পর্যায় ভুল। খুব বেশি রক্তের শর্করা, গুরুতর অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার বা গর্ভাবস্থায় ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে। এটি চিকিৎসার একটি কার্যকর পদ্ধতি, ব্যর্থতার চিহ্ন নয়।

ডায়াবেটিস থাকলেও কোনো উপসর্গ না থাকলে পরীক্ষা দরকার নেই ভুল। দীর্ঘদিন উপসর্গ ছাড়াই রক্তের শর্করা বেশি থাকতে পারে। ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা করালে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এক দিন রক্তের শর্করা স্বাভাবিক হলেই ডায়াবেটিস সেরে গেছে ভুল। একবারের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের গ্লুকোজ ও HbA1c পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিশেষ ‘ডায়াবেটিক’ বিস্কুট সবসময় নিরাপদ ভুল। এসব বিস্কুটেও ময়দা, শর্করা, চর্বি ও ক্যালরি থাকতে পারে। প্যাকেটের উপাদান ও পুষ্টিতথ্য দেখে পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। ডায়াবেটিস হলে ফলের বদলে ফলের রস খাওয়া ভালো ভুল। ফলের রসে আঁশ কম থাকে এবং দ্রুত বেশি শর্করা গ্রহণ হয়ে যেতে পারে। গোটা ফল সাধারণত ভালো পছন্দ।

বেশি হাঁটলেই ওষুধের প্রয়োজন হবে না ভুল। হাঁটা ও নিয়মিত ব্যায়াম উপকারী, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধও প্রয়োজন।ব্যায়াম চিকিৎসার বিকল্প নয়; এটি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে রোগ ভুল। একসঙ্গে খাওয়া, হাত মেলানো বা একই বাড়িতে থাকার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ছড়ায় না।

ডায়াবেটিস হলে ক্ষত শুকায় না, তাই পায়ের ক্ষত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই এটি বিপজ্জনক ধারণা। রক্তের শর্করা বেশি থাকলে ক্ষত শুকাতে দেরি হতে পারে এবং সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে। পায়ে ফোসকা, ক্ষত, লালভাব বা ফুলে যাওয়া দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

ডায়াবেটিসে শুধু চোখ ও কিডনির ক্ষতি হয় ভুল। হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্কের রক্তনালি, স্নায়ু, পা ও মুখের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিয়মিত চোখ, কিডনি, পা ও হৃদ‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীকে আলাদা খাবার রান্না করে দিতে হবে সবসময় নয়। পরিবারের সবার জন্য কম তেল, পরিমিত লবণ, পর্যাপ্ত শাকসবজি ও সুষম খাবার উপকারী। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ভাত, রুটি ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ সমন্বয় করা যায়।

ডায়াবেটিস হলে স্বাভাবিক যৌনজীবন বা সন্তান ধারণ সম্ভব নয় ভুল। যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক যৌনজীবন ও পরিবার পরিকল্পনা করতে পারেন। গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থায় রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিস হলে জীবন আর স্বাভাবিক থাকবে না ভুল। সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়েও কর্মক্ষম ও সক্রিয় জীবনযাপন সম্ভব। বাংলাদেশের বাস্তবতায় করণীয় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যয়বহুল বা বিদেশি খাবার অপরিহার্য নয়। দেশীয় শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম, পরিমিত ভাত এবং উপযুক্ত পরিমাণে গোটা ফল দিয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা তৈরি করা যায়। চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, মিষ্টি শরবত, অতিরিক্ত মিষ্টি ও নিয়মিত অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার কমাতে হবে। 

সামর্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের শর্করা ও HbA1c পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি মূল্যায়ন, চোখ ও কিডনি পরীক্ষা এবং পায়ের যত্ন নিতে হবে। ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহারকারীদের রক্তের শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।

ডায়াবেটিস নিয়ে ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও সময়মতো পদক্ষেপ। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া পরামর্শ বা অলৌকিক নিরাময়ের আশায় চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন, নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
  
   (মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   ডায়াবেটিস  প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা  সময়ের আলো  জনস্বাস্থ্য সমস্যা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: