গ্রাফিক : সময়ের আলোবিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল হঠাৎ মনে হলেও তার পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অর্থনীতির চাপ আর ভূরাজনৈতিক হিসাব। ২০২৬ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ সেটাই আবার দেখাল। ইসরাইলে নেতানিয়াহুর জোট সরকার গড়ার মতো আসন পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষই হারিয়েছে। মিশিগান থেকে আবদুল এল সাইয়েদ হয়েছেন প্রথম মুসলিম সিনেটর। তিনটি ঘটনাই বলছে, কোনো নেতার আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। তবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে আরও বড় একটি কথা আছে— নেতা বদলানো আর রাষ্ট্রের মনোভাব বদলানো এক জিনিস নয়।
আগে ইসরাইলের হিসাব দেখা যাক। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গড়তে লাগে ৬১ আসন। চূড়ান্ত ফলে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩, গাদি আইজেনকোটের জোট ৪৮ এবং আরব দলগুলো ১৯ আসন। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী আইজেনকোট নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করতে রাজি নন, আবর্তনভিত্তিক সরকারেও নয়।
আবার আইজেনকোটের জোটের অনেক নেতা আরব দলের সঙ্গে জোটে অনীহা দেখিয়েছেন। ফলে কোনো পক্ষের সামনেই সহজ পথ নেই। নেতানিয়াহু দুর্বল হয়েছেন কিন্তু তার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু বিদায় নিলে ফিলিস্তিনিরা কি স্বস্তি পাবেন? আমার মত, সেই নিশ্চয়তা নেই। আইজেনকোট ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আগস্টের এক সাক্ষাৎকারে তিনি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে অবাস্তব বলেছেন এবং পশ্চিম তীরের বসতি শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে। অথচ অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। চরমপন্থি বসতিকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করা আর পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো এক কথা নয়। এটি আমার মূল্যায়ন যে ব্যক্তির বদল হলেও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কাঠামো সহজে নড়বে না।
যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা হাউস ও সিনেট দুটোই জিতেছে। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, মিশিগান ও কানসাসে রিপাবলিকান আসন তাদের দখলে গেছে। ২০০৬ সালে বুশের পর এই প্রথম কোনো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট একসঙ্গে দুই কক্ষ হারালেন। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, পরাজয়ের একটি অংশ ইরানের কারণে ঘটেছে। তবে ভোটারদের ক্ষোভের মূল জায়গা ছিল মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও মুদির খরচ। রায়টা যুদ্ধের নৈতিকতার ওপর যতটা, তার চেয়ে বেশি যুদ্ধের দামের ওপর।
ক্ষমতার সীমাও পরিষ্কার। ডেমোক্র্যাটরা কমিটির চেয়ারম্যান হবে, তদন্ত ও তলবের ক্ষমতা পাবে, কিন্তু ভেটো ছাপিয়ে যাওয়ার মতো দুই-তৃতীয়াংশ তাদের নেই। যুদ্ধটি ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই শুরু হয়েছিল। ১১ ডিসেম্বরে সরকারি তহবিলের মেয়াদ শেষ হবে, সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় চাপের হাতিয়ার। কিন্তু মাঠে সেনা থাকলে তহবিল আটকানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছেন, আর নির্বাচনের চাপ না থাকায় ট্রাম্প উল্টো আরও বেপরোয়া হতে পারেন। আবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানকে চিঠি পাঠিয়ে আলোচনা চালুর চেষ্টা করেছেন বলে খবর আছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনেও এক সুর নেই।
তা হলে ট্রাম্পের পরাজয় কি ইরানের জন্য স্বস্তির খবর? আমার উত্তর, অতি আশাবাদের কারণ নেই। এটি আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ, কোনো সূত্রের দাবি নয়, ইরানের প্রতি মার্কিন কঠোরতা তিন স্তরে গাঁথা। প্রথম স্তর প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার আইনি কাঠামো, কংগ্রেসের ইতিহাস আর নিরাপত্তা আমলাতন্ত্র। দ্বিতীয় স্তর রাজনৈতিক, কারণ ইরান নিয়ে নরম দেখালে ভোটের বাজারে লাভ নেই, তাই ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের সমালোচনা করবে ব্যয় ও কংগ্রেসের এখতিয়ারের যুক্তিতে। তৃতীয় স্তর কৌশলগত, কারণ পরমাণু কর্মসূচি আর ইসরাইলের নিরাপত্তা দুই দলেরই স্পর্শকাতর জায়গা। আমার ধারণা, যুদ্ধের তীব্রতা কমতে পারে, কিন্তু ইরানকে স্থায়ী হুমকি হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে যাবে। এ বৈরিতা ব্যক্তির নয়, কাঠামোর।
এল সাইয়েদের জয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। মিশিগান থেকে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে তার নির্বাচিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি প্রতীকী মোড়। নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প তাকে ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। এই ধরনের ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক আক্রমণ ভোটের মাঠে সাধারণত সন্দেহ ও বিভাজন উসকে দেয়। তবু মিশিগানের ভোটাররা সেই প্রচারে কান না দিয়ে তাকেই বেছে নিয়েছেন। এটা শুধু একজন প্রার্থীর জয় নয়, একধরনের বিদ্বেষের রাজনীতির সীমা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াও বটে।
তবে আবেগের জায়গায় থেমে না থেকে হিসাবটাও মেলানো দরকার। একশ সদস্যের সিনেটে তিনি মাত্র একজন। একজন সিনেটরের পক্ষে এককভাবে পররাষ্ট্রনীতির দিক ঘোরানো প্রায় অসম্ভব, বিশেষ করে যেখানে ইসরাইল ও ইরান প্রশ্নে দুই দলের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান বহুদিনের। তা ছাড়া তার প্রচারের কেন্দ্রে ছিল স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয়, যে বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মূল চিন্তাও ছিল। অর্থাৎ ভোটাররা তাকে বেছে নিয়েছেন পকেটের চাপ আর দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্নে, পররাষ্ট্রনীতির কোনো নতুন দিকনির্দেশনার জন্য নয়। প্রতিনিধিত্ব জরুরি এবং তার প্রতীকী ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক। কিন্তু প্রতিনিধিত্ব নিজে থেকে নীতি বদলের নিশ্চয়তা নয়, বিশেষ করে সেই নীতির ভিত যদি রাষ্ট্রের গভীর কাঠামোয় গাঁথা থাকে।
এখন প্রশ্ন, এই পালাবদলে বাংলাদেশের কী হবে? আমার পর্যবেক্ষণ, আশু স্বস্তির সম্ভাবনা কম। আমাদের প্রায় সব জ্বালানিই আমদানি করতে হয়, আর গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ মেটানো হয় আমদানি করা এলএনজিতে। ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের বরাতে বলা হয়েছে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে আমাদের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়। যুদ্ধ যদি ধীরে ধীরে থামেও, ইরানের সঙ্গে মার্কিন দরকষাকষি দীর্ঘ হলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকবে। তাই দাম হঠাৎ নেমে আসবে ভেবে বসে থাকা ঠিক হবে না। আমি দেখছি জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ আর প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ আরও কিছুদিন থেকে যাবে।
তা হলে আমাদের কী করা উচিত? এগুলো আমার ব্যক্তিগত সুপারিশ। প্রথমত কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা দরকার। আমার বিবেচনায় এই মজুদের অভাবের কারণেই সংকটের সময় আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা শুরু হয়। দ্বিতীয়ত আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো বিকল্প উৎস খুঁজে দেখা এবং সংকটকালে স্পট বাজারের সুযোগ নেওয়া আমি যুক্তিসংগত মনে করি।
তৃতীয়ত ভর্তুকির বোঝা কমাতে সৌর ও বায়ুর মতো দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে কারণ আমদানিনির্ভরতা যত কমবে, ওয়াশিংটনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমাদের ঘরে আগুন লাগার ভয়ও তত কমবে। চতুর্থত কূটনীতিতে নিরপেক্ষ ও সতর্ক থাকা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও পোশাক রফতানির সম্পর্ক রক্ষা করে ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রবাসী কর্মসংস্থান ও জ্বালানি যোগাযোগও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। পঞ্চমত রিজার্ভ ও বিনিময় হার সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান জরুরি কারণ ব্যয় বাড়লে সুদের হার নরম করার পরিকল্পনা আটকে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নেতানিয়াহুর জোটের পিছিয়ে পড়া মানেই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়। ট্রাম্পের পরাজয়ও ইরানের জন্য শান্তির গ্যারান্টি নয়। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা পরিষ্কার। বিদেশের ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা নিছক দর্শক হয়ে থাকতে পারি না কারণ সেই লড়াইয়ের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত আমাদের বাজারদর, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, কারখানার উৎপাদন আর প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে এসে লাগে। নেতৃত্ব বদলায় ভোটের হিসাবে। নীতি বদলায় রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থ আর জনমতের দীর্ঘ চাপে। তাই আমাদের ভরসা রাখতে হবে নিজেদের প্রস্তুতির ওপর।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে