ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩৪ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলোছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সূতিকাগার। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাষায়, ‘মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক জীব।’ আর এই রাজনীতির প্রথম পাঠশালা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছাত্র সংসদ হলো এমন একটি মঞ্চ যেখানে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়করা তৈরি হন, যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের চর্চা হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার সুনিশ্চিত হয়।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বা হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদগুলো শিক্ষার্থীদের কেবল প্রতিনিধিত্বই করে না, বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ, সমঝোতা, সহনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। বিশ্বব্যাপী ছাত্র সংসদ হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে তরুণরা নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি ক্ষুদ্র রূপ প্রত্যক্ষ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ছাত্র সংসদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ছাত্র সংসদগুলো জাতীয় রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন জাতীয় খবরের শিরোনাম হয়। এই অঞ্চলে ছাত্র সংসদগুলো সামাজিক বৈষম্য, ফি বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন মানে কেবল প্রতিনিধি বাছাই নয়, এটি রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই এবং তরুণ প্রজন্মের পালস বোঝার একটি মাধ্যম।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘ডাকসু’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) যে ভূমিকা পালন করেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে গৌরবময় অতীত। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ছাত্রনেতারা জাতীয় সংকটে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ছাত্রনেতারা জীবন দিয়েছেন। আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু, রাকসু, জাকসু ও চাকসুর নির্বাচিত নেতাদের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতনের পেছনে ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ ছিল মূল চালিকাশক্তি। নব্বইর আন্দোলনে ডাকসু নেতাদের ঐক্যবদ্ধ পদত্যাগ স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করেছিল। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন এবং লাইব্রেরি সুবিধা বৃদ্ধিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিকাংশ সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা। ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার উত্থান। তোফায়েল আহমেদ (ডাকসু ভিপি), রাশেদ খান মেনন, আ স ম আবদুর রব (যিনি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন), আমান উল্লাহ আমান প্রমুখ জাতীয় রাজনীতির শিখরে পৌঁছেছেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় ৭০ শতাংশই প্রাক্তন ছাত্রনেতা।
তবে অদ্যাবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জয়ী হওয়া কোন ছাত্রনেতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনি। এ ছাড়া করোনাকালে এবং ২০২৪-এর বন্যার সময় ছাত্রনেতাদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, ‘সবুজ ক্যাম্পাস’ গড়ার উদ্যোগ এবং মেধাবী গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার অক্সিজেন। দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন বন্ধ থাকায় ছাত্ররাজনীতিতে এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব তৈরি হয়েছিল। যেহেতু ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রধান তাৎপর্য হলো এটি ‘ভোটের অধিকার’ ও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করে। যখন নিয়মিত নির্বাচন হয়, তখন ছাত্রনেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এটি পেশিশক্তি ও লেজুড়বৃত্তি কমিয়ে মেধাভিত্তিক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে।
তবে সময়ের আবর্তে ছাত্ররাজনীতির চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে। ডাকসু থেকে শুরু করে বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জকসু’ পর্যন্ত যে বিবর্তন, তা কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির মেধা ও মনন গঠনে নবপ্রজন্মকে বোঝার প্রক্রিয়া হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির নতুন মেরুকরণ ঘটে। ২০২৫ সালের শেষার্ধ এবং ২০২৬ সালের শুরুতে ডাকসু, জাকসু, রাকসু, জকসু এবং চাকসু ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে একাধিক ছাত্র সংগঠনের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
১. ডাকসু : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ লক্ষ করা গেছে। এই নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা ডিজিটাল প্রচারের চেয়ে ইস্যুভিত্তিক বিতর্ককে প্রাধান্য দিয়েছে।
২. জকসু : প্রথমবারের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করে। নতুন ক্যাম্পাস ও হল নির্মাণের দাবিতে প্রার্থীরা সোচ্চার ছিলেন।
৩. জাকসু : পরিবেশ রক্ষা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ রোধের দাবিতে এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।
৪. রাকসু ও চাকসু : আঞ্চলিক ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি জাতীয় সংগঠনগুলোও অংশ নেয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সেশনজট কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল মূল বিষয়।
সাম্প্রতিক ২০২৫-২৬-এর নির্বাচনগুলোতে কিছু ঘটনা লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রপাগান্ডা ছড়ানো, ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসে ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে ব্যালট ছিনতাই বা কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা ছিল শূন্যের কোঠায়।
একটি ছাত্র সংগঠনের নিরঙ্কুশ জয় ও অন্যদের ব্যর্থতার কারণ-২০২৬ সালের নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠন নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো : তারা কেবল রাজনৈতিক বুলি না আউড়িয়ে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডাইনিং, লাইব্রেরি ও আবাসিক হলে বারবার গমন করেছে এবং সমস্যাগুলো সমাধান করবে বলে আশ্বস্ত করেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছে, তারাই ফল পেয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্রনেতাদের মূল রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে হয়। এর কারণ হলো অর্থায়ন ও পদোন্নতি, মূল দল থেকে আর্থিক সুবিধা এবং ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় ছাত্রনেতারা আদর্শ বিসর্জন দেন। নিরাপত্তাÑ ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বড় ভাইদের ছত্রছায়া প্রয়োজন মনে করেন।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররাজনীতির নামে হল দখল, টেন্ডারবাজি এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের হত্যার ঘটনা জাতীয় কলঙ্ক। কিছু নেতার ক্ষমতার দম্ভ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ছাত্ররাজনীতির ইমেজ ক্ষুণ্ন করেছে। তবে এটি বন্ধ হওয়া জরুরি, কারণ লেজুড়বৃত্তি করলে ছাত্ররা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ভুলে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। অনেক সময় আমরা ছাত্রনেতাদের মুখে বিকৃত ইতিহাস শুনতে পাই। যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা প্রদান করে। ছাত্রনেতাদের অবশ্যই বাংলাদেশের ‘সত্য ইতিহাস’ বলতে হবে। ১৯৫২ থেকে এ পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনের পেছনের নায়কদের সঠিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ছাত্রনেতাদের দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় নেতাদের বিষয়ে সম্মান রেখে কথা বলা উচিত। এটি একজন নেতার রুচিবোধ ও বংশগত মর্যাদার পরিচয় দেয়। গালাগাল বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নেতৃত্বকে কলঙ্কিত করে। বাঙালি জাতি ছাত্রনেতাদের কাছে বিনয়, সততা এবং দেশপ্রেম আশা করে। শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকে অভিভাবকসুলভ আচরণ চায়।
নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের মূল কাজ শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে। শিক্ষক নিয়োগে প্রভাব খাটানো বা টেন্ডারে যুক্ত হওয়া তাদের কাজ নয়। তাদের সীমানা হতে হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা পর্যন্ত। ছাত্রনেতারা আগামীর নীতিনির্ধারক। তারা যদি দুর্নীতিমুক্ত, সহনশীল এবং দূরদর্শী হন, তবে জাতি আলোর পথ পাবে। তারা ক্যাম্পাসে বৈচিত্র্যময় চিন্তার সম্মান প্রদর্শন করলে জাতীয় পর্যায়েও তার প্রতিফলন ঘটবে। যৌক্তিক প্রতিবাদ এবং গঠনমূলক সমালোচনা চর্চার মাধ্যমে তারা সমাজকে কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে পারে।
ডাকসু থেকে জকসু এই পথচলায় ছাত্ররাজনীতি অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা সাময়িক কিন্তু আদর্শ চিরস্থায়ী। যদি তারা লোভের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তবে বাংলাদেশ একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ছাত্র সংসদ হোক মেধার লড়াই, যুক্তির খেলা এবং দেশ গড়ার শপথ।