যে কারণে গণভোটে সচেতনতা প্রয়োজন

মোজাহিদ হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের সবকিছুর ব্যবস্থা করাই গণতন্ত্রের বাস্তব প্রতিফলন। তেমনিভাবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ

2026-02-10T04:12:03+00:00
2026-02-10T04:12:03+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
যে কারণে গণভোটে সচেতনতা প্রয়োজন
মোজাহিদ হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:১২ এএম 
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের সবকিছুর ব্যবস্থা করাই গণতন্ত্রের বাস্তব প্রতিফলন। তেমনিভাবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো গণভোট। গণভোট মূলত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের ওপর জনগণের সমর্থন আছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য অনুষ্ঠিত ভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ব্যালটে সিল দেওয়া হয়। 

‘গণভোট’ নাম ও ব্যবহার ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে সুইস ক্যান্টন গ্রাউবুনডেনে উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গণভোটের ব্যবহার কিছুটা কমে গেলেও, ১৯৭০-এর দশক থেকে আবার এটি একটি রাজনৈতিক উপকরণ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

গণভোট একটি প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বিষয়ে বা সংবিধানের কোনো পরিবর্তনের প্রশ্নে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ করা হয়। সাধারণ নির্বাচনে মানুষ প্রতিনিধি নির্বাচন করে, কিন্তু গণভোটে মানুষ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ সূচক প্রশ্নের ওপর ভোট দেয়। সহজ কথায়, সরকার যখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে জনগণের সরাসরি সমর্থন চায়, তখন গণভোটের আয়োজন করা হয়। একটি দেশের শাসনব্যবস্থা এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত হয় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। পরে সেটি পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে হাইকোর্ট এক রায়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করেছেন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত গণভোট হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে প্রথম দুটি ছিল ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও তাদের কর্মসূচির প্রতি আস্থা-সংক্রান্ত। তৃতীয়টি হয় রাষ্ট্রপতি থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রস্তাব নিয়ে। এবার চতুর্থ গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। এবারের গণভোট হবে জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক সংস্কার অনুমোদনের জন্য। 
বাংলাদেশে তিনটি গণভোটের মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট আর একটি সাংবিধানিক গণভোট।  প্রথম প্রশাসনিক গণভোট হয় ১৯৭৭ সালে। লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন কার্যের বৈধতা দান। এতে ফলাফল ৯৮.৮০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল। 

দ্বিতীয় প্রশাসনিক গণভোট ১৯৮৫ সালে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমর্থন যাচাইয়ের লক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট। ফলাফল ৯৪.১৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল। আর তৃতীয়টি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী আইন প্রস্তাবের বিষয়ে-যার ফলাফল ৮৪.৩৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছ।
এবার আয়োজন হচ্ছে দেশের চতুর্থ গণভোট। 

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ এই গণভোট। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকারের পতন হয়। এর পরপরই দেশে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠন করা। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা বাংলাদেশের সংবিধান পুনর্গঠনের জন্য একটি জাতীয় রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত। সনদে প্রস্তাবিত হয়েছিল সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্মাণ, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। এই সনদের বৈধতা ও জনগণের অনুমোদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৬ সালে একটি জাতীয় গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। 

গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা প্রত্যক্ষভাবে তাদের মতামত প্রদান করবে যে, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান বাস্তবায়িত হবে কি না। বিস্তারিতভাবে এর অন্তর্ভুক্ত থাকছে
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।
২. যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।
৩. আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন : ইন্টারনেট সেবা কখনো বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।
৪. সরকারি দল ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
৫. সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।
৬.ক্ষক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
৭. দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
৮. দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
 ৯. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
১০. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
১১. রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষারও সাংবিধানিক স্বীকৃতি হবে।

গণতান্ত্রিক দেশে ভোট প্রদান করা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার। ব্যক্তি নিজের মতো করে ভোট প্রদান করবে। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই বাংলাদেশের জনগণই রায় দেবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না। দেশের বৃহৎ স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে গণভোটে হ্যাঁ দেওয়ার জন্য দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল নিজেদের মতো প্রচার চালাচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে গণভোটের থেকে নিজেদের দলের প্রচারই বেশি। এ ক্ষেত্রে গণভোট সম্পর্কে অবহিত করা সরকারের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আপামর জনসাধারণের কাছে গণভোট সম্পর্কে অবহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণভোট সম্পর্কে সচেতন করা বা জানানো বেশি জরুরি। গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেক মানুষ আছে যারা গণভোট সম্পর্কে অবহিত না। গণভোটের আয়োজন সম্পর্কেই অজানা। এসব অঞ্চলে জনসচেতনতা খুবই জুরুরি। যেন জনগণ সবকিছু জেনে এবং বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোট প্রদান করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া যেমন ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার, তেমনি সুষ্ঠু জনমত গঠনে ভোট প্রদান করা ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্তব্য।



Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: