রাজনীতিতে নির্বাচনি ইশতেহার ও বাস্তবতা

ওয়াসিম ফারুক, প্রাবন্ধিক

বাংলাদেশে ইশতেহারভিত্তিক রাজনীতির শুরু সেই পাকিস্তান শাসন আমল থেকেই। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ছিল এই ভূখণ্ডে ইশতেহার রাজনীতির প্রথম বড়

2026-02-10T04:15:50+00:00
2026-02-10T04:15:50+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজনীতিতে নির্বাচনি ইশতেহার ও বাস্তবতা
ওয়াসিম ফারুক, প্রাবন্ধিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:১৫ এএম 
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে ইশতেহারভিত্তিক রাজনীতির শুরু সেই পাকিস্তান শাসন আমল থেকেই। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ছিল এই ভূখণ্ডে ইশতেহার রাজনীতির প্রথম বড় দৃষ্টান্ত। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি তৎকালীন পূর্ববাংলার মানুষের ভাষা, অর্থনৈতিক অধিকার ও প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণআকাক্সক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটানোর ইশতেহার ছিল। সেই ইশতেহারের ফলশ্রুতিতে যুক্তফ্রন্টের ভাগ্যে সরকার গঠনের সুযোগ এলেও সেই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবু জনগণের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে ইশতেহার কেবল কাগুজে ঘোষণা নয়, বরং রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তিও হতে পারে। এই ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয় ১৯৬৬ সালের ছয় দফার মাধ্যমে, যা কার্যত একটি রাজনৈতিক ইশতেহার হয়েই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি। 

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছয় দফা জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট অর্জন করে এবং ইশতেহারের বাস্তবতা তখন এক ভিন্ন মাত্রা পায়। এটি আর শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি থাকে না বরং সেই ইশতেহার হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো, জাতীয়করণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাস্তবতায় সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনে দ্রুত অগ্রগতি হলেও জাতীয়করণ নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় বহু প্রতিশ্রুতি কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ইশতেহারের আদর্শিক উচ্চতা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান তৈরি করে।

১৯৭৫ সালে পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ এক সামরিক শাসনের ছায়ায় ইশতেহারের রাজনীতি তার জৌলুস হারায়। জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের আমলে ইশতেহারগুলো মূলত ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ বা জবাবদিহির জায়গা ছিল খুবই সংকীর্ণ। 
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইশতেহার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রায় সব প্রধান দলই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ সময় ইশতেহারের ভাষা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও নীতিনির্ভর হয়ে ওঠে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলেও দলীয়করণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিরোধী দলের প্রতি অসহিষ্ণুতা ইশতেহারের আদর্শিক অঙ্গীকারকে ক্ষুণ্ন করে।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘দিন বদলের সনদ’ ইশতেহার রাজনীতিতে নতুন এক ভাষা যোগ করে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, পরিবেশ ও নদী রক্ষা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হলেও বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি, এমন কি শেষ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি অনেকটাই ফাইলে বন্দি হয়ে পড়ে। তবু এ সময় ইশতেহার যে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, সেই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইশতেহার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণা তথ্য-প্রযুক্তি, সেবা খাত ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও অবকাঠামো খাতে অগ্রগতি বাস্তবতায় দৃশ্যমান হয়। তবে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনীতির পরিসর ও নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে। উন্নয়ন সূচক ও গণতান্ত্রিক সূচকের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমেই স্পষ্ট হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তথাকথিত নির্বাচনগুলোতে ইশতেহার অনেকাংশে উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণাপত্রে রূপ নেয়। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্য তুলে ধরা হলেও জবাবদিহি, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাসহ গণতন্ত্রের সব স্তম্ভ অনুপস্থিত থাকায় সেই সময়ের ইশতেহার ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণার নামান্তর। ইশতেহার তখন আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং অতীতের সাফল্যের তালিকায় পরিণত হয়।

বর্তমানে আমরা ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে যে রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলছে, তা জনমনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো আধুনিক রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং ২,৫০০ টাকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’র মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিম্নবিত্ত মানুষের মনে আশার সঞ্চার করছে। তবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার মতো বড় অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে যে ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন, তা বর্তমান ঘুণেধরা কাঠামোর মধ্যে কতটা সম্ভব, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে ২০৪০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং ১০,০০০ ডলার মাথাপিছু আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। প্রবীণ ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি নতুন ভাবনা। তবে এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলগুলো ইশতেহারের গড়ে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে। দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস ও বাকস্বাধীনতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইশতেহারের ভাষা ও বাস্তবতার মধ্যে গভীর ফারাক রয়ে গেছে। এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি, জবাবদিহির অভাব ও দলীয়করণের সংস্কৃতি। ইশতেহার পূরণ না হলে দলগুলোকে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ইশতেহার একটি নৈতিক ঘোষণার বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারে না।

তবু ইশতেহারকে পুরোপুরি অর্থহীন বলা যাবে না। এটি রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা নির্ধারণ করে, নাগরিক প্রত্যাশাকে দৃশ্যমান করে এবং ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা দেয়। প্রশ্ন হলো এ ইশতেহারকে কীভাবে বাস্তব অর্থে জনগণের আস্থার দলিলে রূপান্তর করা যায়। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কেবল ভাষার কারুকাজে তুষ্ট হতে চায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে। তাই ভবিষ্যতের ইশতেহার হওয়া উচিত বাস্তবসম্মত, সময়সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক। ইশতেহারে শুধু কী করা হবে তা নয়, কীভাবে, কখন এবং কোন সম্পদ দিয়ে তা করা হবে তার স্পষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি। ইশতেহার কেবল ভোটের আগে বিলি করার লিফলেট নয়। এটি হওয়া উচিত জনগণ ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার একটি বাস্তব সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির বরখেলাপ হলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলগুলোকে দায়বদ্ধ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে, বাংলাদেশের নির্বাচনি ইশতেহার ভবিষ্যতেও কেবল একটি সাহিত্যচর্চা হয়েই থেকে যাবে জনগণের আস্থা অর্জনের দলিল হয়ে উঠবে না।



Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: