সকাল ৭টা। মতিঝিলের একটা ছোট্ট চায়ের স্টলে দাঁড়িয়ে আছেন মোহাম্মদ আলী। বয়স বছর পঞ্চাশেক হবে। সারাজীবন ঢাকার পথে পথে ভ্যান চালিয়েছেন। হাতে একটা পুরোনো ফোন, স্ক্রিন ভাঙা, তবু চালু। চোখে কিন্তু এক অদ্ভুত আশা। ‘এইবার মনে হয় কিছু একটা হবে’, বলছিলেন তিনি গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে। আলীর মতো আরও কোটি মানুষের এই প্রত্যাশাই আজকের রাজনীতিতে তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনা। প্রশ্ন একটাই কেন এবার মানুষ বিএনপিকে তাদের ভোটের অধিকার দিয়ে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটা বড় মোড়। পনেরো বছরের শাসনের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে বদলের হাওয়া। বিএনপি, যে দল একাধিকবার সরকার চালিয়েছে, আবার ফিরতে চাইছে জনগণের আস্থায়। কিন্তু এই আস্থা কি শুধুই ক্ষোভের ফসল, নাকি এর পেছনে আছে গভীর কিছু কারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক?
দৈনন্দিন জীবনের হিসাব আর পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা
প্রথমেই আসি অর্থনীতিতে। গত দেড় দশকে দেশ অবকাঠামোতে এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট? সেখানে টান পড়েছে আরও বেশি। মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাবারের দাম, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ঘাড়ে চেপে বসেছে। আলী বলছিলেন, ‘আগে দশ টাকায় যেটা কিনতাম, এখন পঞ্চাশ টাকা। ভ্যানের ভাড়া বাড়াই কী করে? মানুষ তো দেয় না।’ এই বাস্তবতা শুধু আলীর নয়, কোটি কোটি মানুষের।
নারায়ণগঞ্জের একটা গার্মেন্টসে কাজ করেন রোকেয়া খাতুন। ‘সারা দিন খাটুনির পর যে মাইনে পাই, তাতে সংসার চলে কীভাবে বলেন? ছেলেমেয়েদের স্কুল, ওষুধপত্রÑ সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠি,’ তার কণ্ঠে ক্লান্তি। রোকেয়ার মতো লাখো শ্রমিক চান জীবনমানে একটু উন্নতি। বিএনপির ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ আর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর যে কথা বলা আছে, সেটাই এই মানুষগুলোর কাছে আশার আলো।
কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুতি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বেশ কিছু বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার, মেধাভিত্তিক নিয়োগ। দুর্নীতি কমাতে একটা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। আইনের শাসন আর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য। শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ ও স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক সুবিধা।
রংপুরের একজন ছোট্ট দোকানদার হারুন রশিদ বলেন, ‘এখন একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে গেলে কত জায়গায় ঘুরতে হয়। ঘুষ না দিলে কাজ হয় না। এই জিনিস যদি বদলায়, তা হলে আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে পারব।’ তবে প্রতিশ্রুতি শোনায় ভালো, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার-সবচেয়ে জোরালো যুক্তি
বিএনপির পক্ষে সবচেয়ে শক্ত যুক্তি হলো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। গত কয়েক বছরে বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদÑ সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকা থাকতেই হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে স্বৈরাচার আসে।’ এই যুক্তিতে বিশ্বাসী অনেকেই মনে করেন, বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা মানে গণতন্ত্রে প্রাণ ফেরানো।
অতীতের পাঠ-ভুলে যাওয়ার নয়
সমালোচকরা অবশ্য মনে করিয়ে দেন, ২০০১ থেকে ২০০৬-বিএনপির শাসনকালে দুর্নীতি, জঙ্গিবাদের উত্থান, সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছিল। এই ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। বিএনপির নেতারা অবশ্য দাবি করছেন, তারা বদলেছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা অতীতের ভুল থেকে শিখেছি। এবার আমরা একটা জবাবদিহিমূলক সরকার দেব যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না।’ কিন্তু মানুষ এখন শুধু কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করতে চায়।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনা
বিএনপির আরেকটা বড় ঘোষণা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা। বিকেন্দ্রীকরণ। জনগণের কাছাকাছি সেবা পৌঁছানো। এই পরিকল্পনা সফল হলে স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যার দ্রুত সমাধান হতে পারে। তবে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর প্রশাসনিক দক্ষতা।
তরুণদের চোখে স্বপ্ন
তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপির প্রধান আবেদন মেধাভিত্তিক চাকরি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, উন্নত শিক্ষা আর স্বাস্থ্য। তারা চায় যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক, কোটার জালে না। বিএনপি যদি কোটা সংস্কার আর মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে, তরুণরা তাদের পক্ষে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা আর সংখ্যালঘু অধিকার
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি বলছে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার স্মৃতি অনেকের মনে এখনও তাজা। এই ভয় দূর করতে হবে কাজের মাধ্যমে, শুধু কথায় নয়। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স আর ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান চাই। কেন মানুষ বিএনপিকে বেছে নেবে?
এখন আসল প্রশ্নে ফেরা যাক। কেন মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে?
প্রথমত পরিবর্তনের তৃষ্ণা। দীর্ঘদিন একই দল ক্ষমতায় থাকলে মানুষ ক্লান্ত হয়। আলী বলেন, ‘একই মুখ দেখতে দেখতে বিরক্ত। নতুন কেউ এলে হয়তো কিছু বদলাবে।’
দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক মুক্তির আশা। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ব্যবসায় জটিলতা- সবকিছু মিলিয়ে মানুষ চাপে। রোকেয়া বলেন, ‘আমাদের জীবনে উন্নতি নেই। বরং কষ্ট বাড়ছে। যে আমাদের কষ্ট বুঝবে, তাকেই ভোট দেব।’
তৃতীয়ত গণতন্ত্রের জন্য তৃষ্ণা। মানুষ চায় তাদের মতামতের মূল্য থাকুক। বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ।
চতুর্থত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। হারুন বলেন, ‘ঘুষ ছাড়া কিছু হয় না। এটা বদলাতে হবে।’ মানুষ চায় স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।
পঞ্চমত মেধার মূল্যায়ন। তরুণরা চায় মেধাভিত্তিক চাকরি, কোটায় নয়। কোটা সংস্কার হলে মেধাবীরা বিএনপির
পক্ষে যাবে।
ষষ্ঠত আইনের শাসন। মানুষ চায় সবার জন্য সমান আইন। কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।
সপ্তমত জাতীয় স্বার্থ। বিএনপির আঞ্চলিক ভারসাম্যের নীতি যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়, জাতীয়তাবাদীরা তাদের পক্ষে যাবে।
অষ্টমত আস্থার সংকট থেকে মুক্তি। মানুষ বর্তমান ব্যবস্থায় আস্থা হারিয়েছে। একটা শেষ সুযোগ দিতে চায়।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব-নতুন দিগন্ত
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারেক রহমান, যিনি তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাক্সক্ষা বোঝেন, আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় বিশ্বাসী, তিনি দলকে নতুন দিক দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তরুণদের সম্পৃক্ত করার নতুন পথ খুঁজেছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মেধাভিত্তিক শাসন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমরা এমন একটা বাংলাদেশ গড়ব যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে, যেখানে মেধা আর পরিশ্রমের মূল্য থাকবে, যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ তার এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক তরুণকে টানছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়, হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের প্রতীক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার তার যে ভিশন, তা লাখো মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে মিলে গেছে। আলী, রোকেয়া, হারুনসহ আরও লাখো মানুষ বিশ্বাস করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বই এই মুহূর্তে দেশকে সামনে নিয়ে যেতে পারে।
জনস্বপ্ন বাস্তবায়নে বিএনপির দায়বদ্ধতা
মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে কারণ তারা স্বপ্ন দেখে একটা উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। তারা চায় এমন একটা দেশ যেখানে তাদের সন্তানরা মেধার ভিত্তিতে এগোবে, যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা আর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। তারা চায় এমন একটা সরকার যা তাদের কথা শুনবে, কষ্ট বুঝবে, সেই অনুযায়ী কাজ করবে।
বিএনপি যদি এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র আর সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে, তা হলে ২০২৬ হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আলী, রোকেয়া, হারুনসহ আরও লাখো মানুষের চোখে যে স্বপ্ন জ্বলছে, সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে।
জনগণ জেগে আছে, সচেতন আছে, তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার। তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, চায় বাস্তবায়ন।
তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব আর বিএনপির সংস্কারমুখী এজেন্ডা যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণে কাজ করে, তা হলে বাংলাদেশ এগোবে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি আর গণতন্ত্রের পথে। এই পথেই রয়েছে আগামীর উজ্জ্বল বাংলাদেশ যেখানে প্রতিটি নাগরিকের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সুযোগ থাকবে।
লেখক : একজন সাধারণ নাগরিক (এরিক এরশাদের মা)
সময়ের আলো/কেএইচও