গ্রাফিক : সময়ের আলো রাজধানী ঢাকায় বাড়ি ভাড়া এখন সাধারণ মানুষের জীবনে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির মানুষকেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে ঘর ভাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে বছরের শুরুতে কোনো আলোচনা ছাড়াই বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন বছরের আগে থেকেই বিভিন্ন বাসায় ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া দিতে না পারলে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। জীবনযাপনের নানা খরচের চাপে থাকা শহুরে মানুষের জন্য এটি নতুন সংকট।
ঢাকার অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন কঠিন হিসাবের মধ্য দিয়ে চলে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থাও স্বস্তিকর নয়। বেতন বাড়ে না, কিন্তু বাড়ি ভাড়া বাড়ে নিয়মিত। অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ালেও বাড়তি কোনো সেবা দেন না। ফলে ভাড়াটেদের ব্যয় বাড়ে, কিন্তু জীবনযাত্রার মান বাড়ে না।
বাড়িওয়ালাদেরও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, লিফট, পানির পাম্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার খরচ বেড়েছে। এসব ব্যয় বিবেচনায় ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেই অজুহাতে ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। ভাড়া নির্ধারণে বাড়ির অবস্থা, অবস্থান, সুযোগ-সুবিধা এবং ভাড়াটের সামর্থ্য বিবেচনায় নিতে হবে। বাড়িওয়ালার ব্যয় বাড়লেই তার সব দায় ভাড়াটের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনে দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। ভাড়ার রসিদ দেওয়া এবং চুক্তির শর্ত মেনে চলার বিধানও রয়েছে। বাস্তবে এসব নিয়মের তোয়াক্কা করেন না অনেক বাড়িওয়ালা। ভাড়াটেরা প্রতিবাদ করলে বাসা ছাড়ার ভয় দেখানো হয়। আইনে বার্ষিক ভাড়া বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বিধান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ হারে ভাড়া নির্ধারণ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এতে ভাড়াটেদের সুরক্ষার বদলে বাড়িওয়ালারাই বাড়তি সুবিধা পাবেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন নির্দেশিকায় দুই বছরের আগে ভাড়া না বাড়ানো, লিখিত চুক্তি ও ভাড়ার রসিদ দেওয়ার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে সমিতি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশকে ভাড়ার ভিত্তি করার বিষয়টি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু নির্দেশিকা প্রকাশ করলেই হবে না। ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি হতে হবে বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও ভাড়াটেবান্ধব। একই সঙ্গে অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনের সীমা মানতে হবে।
সমস্যা হচ্ছে, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধিমালা তৈরি, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিটি ওয়ার্ডে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভাড়ার রসিদ না দেওয়া, চুক্তি না করা, অন্যায়ভাবে ভাড়া বাড়ানো কিংবা ভাড়াটেকে জোর করে উচ্ছেদের চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে উভয়ের অধিকার রক্ষায় নিয়মিত তদারকিও প্রয়োজন।
বাসস্থান মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এই প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা চলতে পারে না। বাড়িওয়ালার ন্যায্য আয় যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভাড়াটের সামর্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার ও সিটি করপোরেশনকে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর ভাড়া বাড়ানোর এই প্রবণতা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। বাড়ি ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা