৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি : স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপরিচয়

শায়রুল কবির খান

মতামত

১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি; দেশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে আমাদের

2026-11-07T07:00:56+00:00
2026-11-07T07:00:56+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি : স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপরিচয়
শায়রুল কবির খান
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:০০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি; দেশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী দল চৌকশ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশের সাধারণ জনগণ ও সিপাহিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সৈনিকদের কাছে ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। বিচক্ষণতার সঙ্গে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ এক বিপ্লব, যা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে মর্যাদার আসন লাভ করেছে।

একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পররাষ্ট্র নীতি সামরিক নীতি ও আর্থ-সামাজিক যে সংকট তৈরি হয়েছিল তার সমাধানের সূত্রপাত হয় ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতির মধ্য দিয়ে।

রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। ভঙ্গুর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রতিনিয়ত তিনি সংকট মোকাবিলা করেছেন ধৈর্যের সঙ্গে। ৭ নভেম্বর বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ফাউন্ডেশন।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের যে ধ্বংসস্তূপ উন্মোচিত হয়েছে, তা থেকে দেশকে পুনর্গঠন করে একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিগত ১৭ বছর ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরকে বিতর্ক সৃষ্টি করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ইতিহাস বিকৃতি করেছিল। ইতিহাসের অমোঘ সত্য আবারও জাগ্রত হয়ে ফিরে এসেছে, সিপাহি-জনতার পাশে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। শেখ হাসিনা সরকার ইতিহাস থেকে ৭ নভেম্বরকে চিরতরে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করেছিল। সর্বশেষ ২০১০ সাল বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৭ নভেম্বর নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে, গণতন্ত্রের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। এরপর আর ৭ নভেম্বরে কোনো সমাবেশ করতে দেয়নি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার।

২০১৭ সাল ১২ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি সর্বশেষ জনসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। সত্যি, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সে কারণেই ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৭ নভেম্বরের চেতনা জনতার মাঝে ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস দুটো শব্দের মধ্যে স্বাধীন স্বার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের সত্তা নিহীত আছে। এর প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

তিনি বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত করেছেন যা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’; ৭ নভেম্বরের চেতনা তার সঙ্গে পরিপূরক। দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই তুলে দিয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা স্বকীয়ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চক্রান্তকারীদের খপ্পর থেকে দেশকে উদ্ধার করে ২৫ বছরের গোলামি চুক্তিকে নিকুচি করে সত্যিকার স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নেয়। ওই সময় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ (গুটিকয়েক বৈদেশিক অনুচর ছাড়া) এবং সশস্ত্রবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা নিয়ে দেশকে উন্নতি, অগ্রগতি ও শান্তির পথে নিয়ে যায়। সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে নস্যাৎ হয়ে যায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী, দেশবিরোধী সব অপকৌশল। আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায় বাংলাদেশ।

৭ নভেম্বরের বিপ্লব সম্পর্কে তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বলা হয়, সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহিরা।

সেই ৭ নভেম্বরও ছিল শুক্রবার। ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। সশস্ত্র বাহিনী দেশবাসীর পাশে আছে, আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন— মহান আল্লাহ আমাদের সহায়। সেদিন ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহি-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে পরিয়ে দেয় ফুলের মালা। বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে ভেসে আসে ফুলের সুবাস। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঁক বদলের তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থানেই দৃশ্যত দেশের কল্যাণে বিএনপি এগিয়ে এসেছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনে পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেও আবারও দেশের কল্যাণে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাঈদ ইফতেখার বলেছেন— দুটো গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক শূন্যতার সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আ. লীগ অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিভাত হয়েছে। সে সুযোগ বিএনপি পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জন-বিদ্রোহ বা জনরোষের ফলে যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেটার রাজনৈতিক ফসল বিএনপি ঘরে তুলেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার একজন জনবিপ্লবীকে মেরে ফেলতে পারবে, কিন্তু বিপ্লবকে মেরে ফেলতে পারবে না। আজকের বাস্তবতায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ইতিহাসও তাই অমোচনীয়, অনস্বীকার্য। ‘৩১-দফা’র ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হবে আগামীর ‘সোনালি বাংলাদেশ’।

সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ৭ নভেম্বর  বিপ্লব  সংহতি  স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ  আত্মপরিচয়  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: