ব্যক্তিতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি এড়াতে একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাবে অনড় রয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার যুক্তিতে কিছু মতামত এলেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ক্ষমতাসীন দল।
তবে বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতভিন্নতার বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যসহ সংবিধানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব এসেছে। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সংসদে উপস্থাপনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিশেষ কমিটি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার ও মঙ্গলবার দুই দফায় গণমাধ্যমের সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের বার্তা ব্যবস্থাপক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সরকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিতে চায়। বিরোধী দলকেও বিশেষ কমিটিতে যুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের কোনো প্রস্তাব বা আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা বিবেচনা করা হবে। তবে এ জন্য বিরোধী দলকে আগে আলোচনায় আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার প্রস্তাব নিয়ে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আলোচনায় কেউ কেউ মত দিয়েছেন, একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করলে এবং জনগণ তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইলে সেই অধিকার থাকা উচিত বলে মত দিয়েছেন তারা।
তবে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি রোধ করার লক্ষ্যেই একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনি ইশতেহারেও তা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই আমরা এখনও আমাদের এ প্রস্তাবে অনড় রয়েছি। তবে সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাবের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় ধরনের মতামত এসেছে। একদিকে দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তির ক্ষমতায় থাকার ঝুঁকি এড়ানোর বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, অন্যদিকে জনগণের পছন্দ অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। কমিটি এসব মতামত পর্যালোচনা করবে বলে জানান তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো, গঠনপ্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে কারা যুক্ত থাকবেন, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বিশেষ কমিটি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চেয়েছে কমিটি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে গঠিত হবে, কোন প্রক্রিয়ায় এর সদস্য নির্বাচন করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে কী ধরনের ধাপ অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। আবার কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টও রয়েছে।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতিগুলো নিয়ে সবার মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা হওয়া দরকার। এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। কোন পদ্ধতি দেশের জন্য উপযুক্ত হবে, তা সংসদে বিবেচনা করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনও আমরা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রয়োজন। বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করে যে পদ্ধতিকে জাতির জন্য উপযুক্ত মনে করা হবে, সংসদ তা বিবেচনা করবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে মতপার্থক্য নিরসনের বিষয়ে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সরকার সেই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে সনদের বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। বিরোধী দল যদি আলোচনায় আসে এবং জুলাই জাতীয় সনদের কোনো কোনো অংশে পরিবর্তন বা ব্যতিক্রমের প্রস্তাব দেয়, তা হলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগও রয়েছে। তবে সে জন্য তাদের আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটি সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধান সংশোধন করতে চায়। গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিরোধী দলের প্রতি এ আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে তারা নিজেদের প্রস্তাব ও মতামত নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলোও আলোচনার আওতায় আসতে পারে। সংসদে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়েও মতামত এসেছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কিছু রাজনৈতিক ও নীতিগত বিষয়ও রয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত পাওয়া গেছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু প্রস্তাব বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে সব প্রস্তাব একত্র করে কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। লিখিত প্রস্তাবগুলো জমা হওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে বিশেষ কমিটির। গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
এ ছাড়া গত ১৭ বছরে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, জীবিত ভুক্তভোগী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের পরিবারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত ও অভিজ্ঞতা থেকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। এরপর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে সংশোধনবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গেও আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যারা অবদান রেখেছেন, তাদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে।
সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপন ও পরবর্তী আলোচনা হবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি