জুলুম-অত্যাচার অত্যন্ত নিন্দনীয়, দূষণীয় এবং পরিত্যাগযোগ্য একটি গুনাহের কাজ। কুরআন ও হাদিসের বিশাল অংশজুড়ে যেসব বিষয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে, আর বেঁচে থাকার জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ‘জুলুম’। আজ চারদিকে ও সব ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা মানুষের মধ্যে জুলুমের ছড়াছড়ি ও সয়লাব। অথচ মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই, একই মায়ের সন্তানের মতো। সেই হিসেবে তাদের মধ্যে দয়া, মায়া-মমতা, ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভ্রাতৃত্ববোধ থাকাটা ছিল যুক্তিযুক্ত ও অপরিহার্য একটি বিষয়। কোথাও জুলুম হতে দেখলে সবার কর্তব্য সাধ্যমতো তা বন্ধের চেষ্টা করা। অন্তত জুলুমে সহযোগিতা না করা। জুলুম-অত্যাচারে সহযোগিতার নানা ধরন ও পদ্ধতি আছে।
আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা : আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো শক্তিকে সমান মনে করা শিরক এবং এটাও এক প্রকার জুলুম। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(সেই সময়কে) স্মরণ কর, যখন লোকমান তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শিরক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।’ (সুরা লুকমান : ১৩)। বোঝা গেল, ‘জুলুম’ অর্থ একজনের হক কেড়ে নিয়ে অন্যকে দিয়ে দেওয়া। এই হিসেবে শিরক চরম জুলুম বৈকি! কেননা ইবাদত কেবল আল্লাহ তায়ালার হক। শিরককারী আল্লাহ তায়ালার এ হক তাঁকে না দিয়ে তাঁর নিজেরই কোনো মাখলুক ও বান্দাকে দিয়ে দিল।
জুলুম মানে হারামে লিপ্ত হওয়া : জুলুমের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। যা মানবতাবিরোধীও বটে। তাই স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য জুলুম হারাম করেছেন এবং অন্য সবার জন্য জুলুম হারাম করে দিয়েছেন। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি জুলুম আমার নিজের জন্য হারাম করেছি এবং তা তোমাদের মাঝেও হারাম করলাম।’ (মুসলিম : ২৫৭৭)
আল্লাহর গজব আসে : জুলুম-অত্যাচারের নানা ভয়াবহ পরিণতি আছে, এর মধ্যে একটি পরিণতি হলো— আল্লাহ তায়ালার ‘গজব’। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বিবাদে অন্যায়মূলক কারও সাহায্য করল, সে আল্লাহর গজবে পতিত হলো।’ (আবু দাউদ : ৩৫৯৮)
মজলুমের দোয়া ব্যর্থ হয় না : মজলুম যখন জালেমের নানা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে তার বিরুদ্ধে কোনো বদ দোয়া করে, সেই দোয়া আল্লাহর কাছে অতি দ্রুত কবুল হয়ে যায়, তা কখনো প্রত্যাখ্যান হয় না। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যান হয় না। ন্যায় পরায়ণ শাসক, রোজাদারের দোয়া ইফতারের আগ পর্যন্ত, মজলুমের দোয়া।’ (ইবনে মাজাহ : ১৭৫২)।
আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নির্যাতিত মজলুমের বদ দোয়া হতে বেঁচে থাকো, কারণ তার বদ দোয়া ও আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো আড়াল নেই।’ (মেশকাত)
জালেম-মজলুমের সাহায্য : মুসলমান যেহেতু পরস্পর ভাই ভাই, তাই উচিত হলো— তাদের বিপদে-আপদে সাহায্য সহযোগিতা করা। জালেম-মজলুম উভয়ই তাদের পরিণতির দিক থেকে বিপদের ভেতরে আছে। তাই তাদের সাহায্য করা আমাদের ওপর একান্ত দায়িত্ব। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আনাস বিন মালেক (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত। বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! অত্যাচারিতকে সাহায্য করার বিষয়টি বুঝলাম, কিন্তু অত্যাচারীকে কীভাবে সাহায্য করব?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি তাকে অত্যাচার থেকে বাধা দেবে। তা হলেই তাকে সাহায্য করা হবে।’ (বুখারি : ৬৯৫)
জুলুমের পরিণতি জাহান্নাম : জুলুমের নানা ভয়াবহ পরিণতির মধ্যে সর্বাধিক ভয়াবহ পরিণত হলো— জাহান্নামে যাওয়া। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু উমামাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কসমের মাধ্যমে কোনো মুসলমানের হক নষ্ট করে, তার জন্য আল্লাহ তায়ালার জাহান্নাম অবধারিত। তখন কোনো এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! অতি সামান্য বস্তু হলেও? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, (বাবলা গাছের মতো এক ধরনের কাঁটাযুক্ত) গাছের ডাল হলেও এ শাস্তি দেওয়া হবে।’ (মুসলিম : ২৫০)
জুলুম কেয়ামতের অন্ধকার : এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অত্যাচার করা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ অত্যাচার কেয়ামতের দিনে ঘন অন্ধকারে পরিণত হবে।’ (মুসলিম : ৬৭৪১)
জুলুমে সহযোগিতার পরিণতি : সমাজে কিছু ভালো মানুষ এখনও আছে যারা জুলুম, অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করে। জুলুম ও জালেমের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। আবার এমন কিছু লোক আছে, তারা জুলুমকে রোধ করে না, জুলুম-নির্যাতনের সামান্য প্রতিবাদও করে না, বরং জালিম ও অত্যাচারীকে সহযোগিতা করে। হাদিস অনুযায়ী, এ ধরনের লোকও জালিমের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জালিমের শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে চলে অথচ সে জানে ওই ব্যক্তি জালিম, তখন সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।’ (মেশকাত : ৪৯০৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.)
আরও বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সেই বান্দাই মর্যাদায় সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাব্যস্ত হবে, যে অন্যের পার্থিব কল্যাণে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। অর্থাৎ কোনো জালিমের কাজে সাহায্য করেছে।’ (ইবনে মাজাহ : ৪১০১)। তাই আসুন, আমরা নিজেরা জুলুম-অত্যাচার থেকে বেঁচে থাকি, সঙ্গে সঙ্গে সাধ্যানুযায়ী জুলুম-নির্যাতনের প্রতিরোধ করি এবং জালেমকে সব ধরনের সহযোগিতা থেকে বিরত থাকি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে