বিআরটিএর কর্মকর্তার টেবিল থেকে সরকারি সিল নিয়ে নিজের হাতেই কাগজে মারছেন দালাল। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ফাইল নিয়ে ছুটছেন, কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর-সিল নিচ্ছেন, এমনকি নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে ইশারা করে সেবা গ্রহীতার ছবি তোলার ব্যবস্থাও করছেন তিনি। অথচ তিনি বিআরটিএর কোনো কর্মী নন, বহিরাগত একজন দালাল।
মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। দালালের এমন অবাধ কর্মকাণ্ডের সময় দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যালয়ে নিয়মিত দালালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও কমছে না দালালদের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘ধীরে চলা’ কৌশল এবং অসহযোগিতার কারণে দ্রুত সেবা পেতে দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়তি অর্থের বিনিময়ে দালালরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যে কাজ করে দিচ্ছেন, একই কাজ নিয়ম মেনে করতে গিয়ে সেবা গ্রহীতাদের ঘুরতে হচ্ছে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে, আসতে হচ্ছে একাধিক দিন।
৪ অক্টোবর, রোববার সকাল সাড়ে ১১টা। মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের পরই স্পিকারে দালালদের কাছ থেকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি সেবা প্রত্যাশীদের করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন সতর্কবার্তা শোনা যায়। কিন্তু কার্যালয়ের ভেতরেই তখন অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দালালরা।
একটি পুরোনো মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তনসংক্রান্ত বিষয়ে করণীয় জানতে তথ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করেন সুলতান নামে এক তরুণ। তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়। দায়িত্বরত কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে ব্যক্তিগত কাজ শেষে তাকে বাইরে থেকে স্ট্যাম্প কিনে নিতে বলেন। কিন্তু স্ট্যাম্প কিনে কী করবেন, কোথায় যাবেন কিংবা কী লিখতে হবে— এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে ওই কর্মকর্তা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
ভোগান্তির শুরু সেখান থেকেই। বাধ্য হয়ে প্রধান ফটকের বাইরে স্ট্যাম্পের খোঁজ করেন সুলতান। সেখানেই মেলে ‘সব সমস্যার সমাধান’ নিয়ে অপেক্ষমাণ স্ট্যাম্প বিক্রেতারূপী দালালদের। শুধু স্ট্যাম্প নয়, মালিকানা পরিবর্তন, গাড়ি বিক্রিসহ বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে তাদের কাছে। ‘অনির্দিষ্ট’ অঙ্কের টাকা দিলেই দ্রুত মিলবে সব ধরনের সেবা।
কথা বলে সুলতান বুঝতে পারেন, তারা বিআরটিএর দালাল। তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষ ‘সম্পর্ক’ রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
সেখানকার একজন স্ট্যাম্প বিক্রেতা ও দালাল সিরাজ (ছদ্মনাম) জানান, মালিকানা পরিবর্তনের জন্য সব খরচসহ ৭ হাজার টাকা লাগবে। এর মধ্যে সরকারি জমা প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা। স্ট্যাম্প ও অন্যান্য কাগজের জন্য প্রায় ১ হাজার টাকা এবং অনলাইন করার জন্য লাগবে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা বাড়তি দিলেই সেবা গ্রহীতাকে শুধু স্বাক্ষর, ছবি তোলা ও বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য আসতে হবে। এক দিনেই অনলাইন করা হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট সময়ে এসে শুধু বায়োমেট্রিক বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে হবে।
ওই দালাল আরও জানায়, মোটরসাইকেল ও লাইট ভেহিক্যালের ড্রাইভিং লাইসেন্স করাতে ৯ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগে।
কিন্তু কেউ নিজে নিয়ম মেনে এসব কাজ করতে গেলে তাকে একাধিক দিন বিআরটিএ কার্যালয়ে আসতে হয়। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ছুটতে হয়। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে একই দিনে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব।
নিয়ম অনুযায়ী মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর ও সিল নিতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যেতে হয় অন্য কক্ষে। প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
কিন্তু দালালদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তারা একাধিক ধাপ পার করে ফেলেন। এর বাস্তব প্রমাণও মিলেছে মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে।
মালিকানা পরিবর্তনের কাজ করতে এক দালালের সঙ্গে সরেজমিন থেকে দেখা যায়, কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার অবাধ যোগাযোগ। ফাইল নিয়ে তিনি নিজেই এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাচ্ছেন। নির্দিষ্ট কাগজে কর্মকর্তাদের টেবিল থেকে সরকারি সিল নিয়ে নিজেই কাগজে মারছেন। নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে ইশারা করামাত্র সেবা গ্রহীতার সঙ্গে ওই কর্মকর্তার ছবি তুলে নিচ্ছেন। গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এ ধরনের একাধিক ছবি তোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গাড়ি পরিদর্শনের সময়ও দালালকে পরিদর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর অনলাইন করার জন্য এবং অ্যাকনলেজমেন্ট রসিদের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দিষ্ট কর্মকর্তার কাছে নিজেই জমা দেন। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে দৌড়ে মুহূর্তেই কাজ সারেন তিনি।
দালালকে দেখামাত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার কাজ করে দিচ্ছিলেন। একবারও কাউকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়নি— তিনি কেন বিনা কাজে ওই কক্ষে প্রবেশ করেছেন, কিংবা কেন তিনি নিজের হাতে সরকারি সিল ব্যবহার করছেন। এ সময় সাধারণ সেবা প্রত্যাশীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, ওই ব্যক্তি বিআরটিএর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নন; তিনি একজন বহিরাগত এবং দালাল।
শুধু তাই নয়, ফাইলের মধ্যে বিশেষ চিহ্ন দেওয়ার পাশাপাশি কখনো কখনো দালালরা নিজেদের নামও লিখে দেন। যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বুঝতে পারেন কাজটি কোন দালালের মাধ্যমে এসেছে। পরে অর্থের ভাগ-বাটোয়ারার হিসাব-নিকাশে এসব চিহ্ন ও নাম প্রয়োজন হয় বলে জানান দালালদের একজন।
গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি ফাইলে নিজের নাম লেখার পর এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই দালাল এমনটাই জানান।
সরেজমিন দেখা যায়, নিয়ম মেনে বিআরটিএতে কোনো কাজ করতে গেলে সেবা গ্রহীতাদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। সামান্য ভুলত্রুটির অজুহাতেও আটকে যেতে পারে কাজ। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও দিনের পর দিন বিআরটিএ কার্যালয়ে এসে টেবিল থেকে টেবিলে ধরনা দিতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা গ্রহণের নিয়ম এতটাই জটিল এবং কর্মরতদের কারও কারও আচরণ এত অসহযোগিতামূলক যে সাধারণ মানুষের পক্ষে জরুরি সেবা সহজে পাওয়া কঠিন। আর এই সুযোগই কাজে লাগায় দালাল চক্র। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় বাধ্য হয়ে তাদের শরণাপন্ন হন ভুক্তভোগীরা।
প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের পরই দালাল চক্রের সদস্যদের নিচু গলায় সেবা প্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায় ‘কী করা লাগব’, ‘কোনো কাজ আছেনি ভাই’, ‘কী করাবেন’— এমন নানা প্রস্তাব। সেখানে কর্মরত আনসার সদস্যদের সামনেই এসব কর্মকাণ্ড চলতে দেখা যায়।
ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অপেক্ষার সুযোগ নেয় দালাল চক্র। কার্যালয়ে থাকা ব্যাংকের বুথগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন সেবা প্রত্যাশীরা। আর দালালরা তাদের কাছে গিয়ে প্রস্তাব দেন, ‘লাইনে না দাঁড়াইয়া টাকা দেবেন?’
সেখানকার কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাংকে কর্মরতদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ রয়েছে। ৬০০ টাকা দিলে লাইনে না দাঁড়িয়েই টাকা জমা দেওয়ার স্লিপ পাওয়া যায়।
ট্যাক্স টোকেন, মালিকানা পরিবর্তন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন কাজে টাকা জমা দিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাংকের একাধিক বুথ থাকলেও টাকা জমা নিতে অনেক সময় নেন কর্মরতরা।
নাম পরিবর্তন করতে আসা সুলতান জানান, সিরিয়ালে তিনি মাত্র আটজনের পরে ছিলেন। তারপরও টাকা জমা দিতে তার এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। তার অভিযোগ, ব্যাংকে কর্মরত একজন নারী কর্মকর্তা শুধু টাকা জমার প্রিন্ট কপি দিতেই ২৫ মিনিটের বেশি সময় নিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা তিনবার ভুল প্রিন্ট দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বুথে দায়িত্বরত ব্যাংক কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরে কাজ করেন বলে অভিযোগ করেন সেবা নিতে আসা কয়েকজন। মূলত সেবা প্রত্যাশীদের দালালের দিকে ঠেলে দিতেই এই ‘ধীরে চলো’ নীতিতে কাজ করা হচ্ছে বলে সন্দেহ তাদের।
তবে আগের তুলনায় বিআরটিএতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে বলে জানান দালাল চক্রের একাধিক সদস্য।
তাদের দাবি, সেবার মান আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও কর্মকর্তাদের অনিয়ম পুরোপুরি দূর হয়নি। কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া বহিরাগত কারও পক্ষে এভাবে কাজ করে নেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান তারা। তবে কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
দালালদের হাতে সরকারি সিল ব্যবহারের সুযোগ এবং বিআরটিএ কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে তাদের অবাধ চলাচলের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মাসুদ আলম ও উপপরিচালক কাজী মো. মোরসালীনকে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তারা ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে