সকালের ব্যস্ততা শুরুর আগে এক কাপ গরম কফি অনেকের কাছেই শুধু একটি পানীয় নয়, বরং দিনের শুরু করার পরিচিত অভ্যাস। কারও কাছে এটি ঘুমঘুম ভাব কাটানোর উপায়, কারও কাছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মাঝে সতেজ থাকার সঙ্গী, আবার কারও কাছে প্রিয়জনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর উপলক্ষ। কিন্তু কফি পান করার পর কেন ঘুমভাব কমে যায়? কেন নিজেকে বেশি সতেজ ও মনোযোগী মনে হয়? এর পেছনে রয়েছে কফির অন্যতম সক্রিয় উপাদান ক্যাফেইনের কার্যপ্রক্রিয়া।
ক্যাফেইন কীভাবে কাজ করে?
দিন যত বাড়তে থাকে, মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিক জমতে থাকে। এটি নির্দিষ্ট গ্রহণকারীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে ঘুম ও ক্লান্তির অনুভূতি বাড়ায়। কফির ক্যাফেইন মস্তিষ্কের অ্যাডেনোসিন গ্রহণকারীর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। ফলে কিছু সময়ের জন্য ক্লান্তির অনুভূতি কমে যায় এবং সতর্কতা, মনোযোগ ও সজাগতা বাড়তে পারে।
তবে কফি শরীরের প্রকৃত ক্লান্তি দূর করে না। এটি মূলত ক্লান্তির অনুভূতিকে সাময়িকভাবে আড়াল করে। তাই পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প হিসেবে কফির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
ক্যাফেইনের বাইরেও আছে উপকারী উপাদান
কফির গুরুত্ব শুধু ক্যাফেইনে সীমাবদ্ধ নয়। এতে রয়েছে বিভিন্ন পলিফেনল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও জৈব সক্রিয় উপাদান। বিশেষ করে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পলিফেনল শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে।
কফিতে অল্প পরিমাণে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, নিয়াসিন বা ভিটামিন বি৩, রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি২ এবং ম্যাঙ্গানিজও পাওয়া যায়। তবে কফিকে এসব ভিটামিন ও খনিজের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
নিয়মিত কফি পান কতটা উপকারী?
বিভিন্ন গবেষণায় পরিমিত কফি পান এবং কিছু স্বাস্থ্যগত ফলাফলের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হওয়ার সম্পর্ক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। যকৃতের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কফি পানের সঙ্গে কিছু ইতিবাচক ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ক্যাফেইন শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যায়ামের আগে ক্যাফেইন গ্রহণ কিছু মানুষের সতর্কতা বাড়াতে এবং ব্যায়ামকে তুলনামূলক কম কষ্টকর মনে করতে সাহায্য করতে পারে। হৃদস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পরিমিত কফি পান সাধারণত বাড়তি হৃদরোগ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত নয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার অনেকগুলোই জনসংখ্যাভিত্তিক পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই কফিকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সুস্থ অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন মোট প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরা হয়। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা আলাদা। এক কাপ কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণও নির্দিষ্ট নয়; কফির ধরন, পরিমাণ, তৈরি করার পদ্ধতি ও কাপের আকারের ওপর তা নির্ভর করে।
অতিরিক্ত ক্যাফেইনে অস্থিরতা, উদ্বেগ, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, পেটের অস্বস্তি ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যাদের ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি, তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কফির সঙ্গে কী যোগ করছি?
সাধারণ কালো কফিতে ক্যালরির পরিমাণ কম। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি, স্বাদযুক্ত সিরাপ, ঘন দুধ, মিষ্টি ক্রিম বা ফেটানো ক্রিম যোগ করলে একই পানীয়তে ক্যালরি ও বাড়তি চিনির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। তাই কফির উপকারিতা বিচার করতে হলে শুধু কফি নয়, এর সঙ্গে কী যোগ করা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভাবস্থায় সাধারণত প্রতিদিন মোট ক্যাফেইন ২০০ মিলিগ্রামের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশু-কিশোরদের নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণও প্রয়োজনীয় নয়। আবার কোনো বিশেষ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কফিকে এক কথায় ভালো বা খারাপ হিসেবে বিচার করার প্রয়োজন নেই। পরিমাণ, পান করার সময়, তৈরির পদ্ধতি, ব্যক্তিগত ক্যাফেইন-সংবেদনশীলতা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপরই এর প্রভাব অনেকটা নির্ভর করে।
লেখক : পুষ্টিবিদ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও