শব্দদূষণ : আধুনিক সমস্যা ও ইসলামি সমাধান

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

ইসলাম

আধুনিক নাগরিক জীবনের অন্যতম বড় সংকটের নাম শব্দদূষণ। মানুষের জীবনযাত্রা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় শব্দের মাত্রা। যানবাহনের হাইড্রোলিক

2026-10-05T23:50:49+00:00
2026-10-05T23:50:49+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
শব্দদূষণ : আধুনিক সমস্যা ও ইসলামি সমাধান
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আধুনিক নাগরিক জীবনের অন্যতম বড় সংকটের নাম শব্দদূষণ। মানুষের জীবনযাত্রা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় শব্দের মাত্রা। যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন, নির্মাণকাজের বিকট আওয়াজ, উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার— সব মিলিয়ে আমাদের চারপাশের পরিবেশ ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। শব্দদূষণকে অনেক সময় কেবল বিরক্তির বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যা। 

শিশুদের পড়াশোনা, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের বিশ্রাম এবং সামগ্রিক জীবনমানের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ ইসলাম মানুষের জীবনকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনার শিক্ষা দিয়েছে। মানুষের কথা বলা, চলাফেরা, সামাজিক আচরণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম শিষ্টাচার, সংযম ও অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। তাই শব্দদূষণের বিষয়টিও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়; বরং এটি মানুষের অধিকার, সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কণ্ঠস্বর ও আচরণে সংযমের শিক্ষা : ইসলাম অপ্রয়োজনীয় উচ্চস্বরে কথা বলা বা বিকট শব্দ করাকে নিরুৎসাহিত করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ’ (সুরা লোকমান : ১৯)। এই আয়াত মানুষের কথাবার্তা ও আচরণে পরিমিতিবোধের শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু তার ইবাদতে নয়; বরং তার ব্যবহার, বিনয় ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যেও প্রকাশ পায়।

অন্যের শান্তি ও ইবাদতের প্রতি সম্মান : ইসলাম কখনো এমন কোনো কাজকে সমর্থন করে না, যার কারণে অন্য মানুষ কষ্ট পায়। এমনকি ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও অন্যের স্বস্তি ও একাগ্রতার প্রতি লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার মসজিদে সাহাবিদের উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনে তাদের সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ রবের সঙ্গে মোনাজাত করছো। 

তাই একে অপরকে কষ্ট দিয়ো না এবং একজনের আওয়াজ অন্যজনের ওপর উঁচু করো না’ (আবু দাউদ)। যেখানে কুরআন তেলাওয়াতের মতো পবিত্র আমলের ক্ষেত্রেও অন্যের অসুবিধা বিবেচনা করা হয়েছে, সেখানে সামাজিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল বা ব্যক্তিগত বিনোদনের নামে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দ সৃষ্টি করার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

রাস্তা ও জনজীবনে শব্দের শিষ্টাচার : ইসলাম জনপথ ও মানুষের চলাচলের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাস্তার হক আদায়ের অন্যতম বিষয় হলো— মানুষকে কষ্ট না দেওয়া। বর্তমানে রাস্তায় অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো, গাড়ির বিকট শব্দ তৈরি করা কিংবা যানবাহনের শব্দ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম অমান্য করা শুধু আইন ভঙ্গ নয়; এটি সামাজিক দায়িত্ববোধেরও অভাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। শব্দদূষণ মানুষের শরীর ও মনে ক্ষতি করে। তাই অপ্রয়োজনীয় শব্দ সৃষ্টি করাও এক ধরনের ক্ষতির কারণ, যা ইসলামি নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীলতা : ইসলাম শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং সব সৃষ্টির প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। অতিরিক্ত শব্দদূষণের কারণে মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পশুপাখি ও প্রকৃতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাখির স্বাভাবিক জীবনযাপন, প্রজনন ও আবাসস্থল শব্দদূষণের কারণে ব্যাহত হতে পারে। ইসলামের শিক্ষা হলো— আল্লাহর সৃষ্ট কোনো জীবকে অকারণে কষ্ট দেওয়া যাবে না।

আমাদের করণীয় : ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, ‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।’ এই নীতির আলোকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মীয়, সামাজিক বা ব্যক্তিগত কোনো আয়োজনই এমন হওয়া উচিত নয়, যার কারণে প্রতিবেশী, অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়। 

মাইক ব্যবহারে সচেতনতা, অপ্রয়োজনীয় হর্ন পরিহার, শব্দ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস এবং অন্যের শান্তির প্রতি সম্মান— এসবই একটি সুন্দর সমাজ গঠনের অংশ। মনে রাখতে হবে, ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, সমাজকে কীভাবে শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে— সেই দিকনির্দেশনাও দেয়। শব্দের ব্যবহারেও চাই সৌন্দর্য, সংযম ও দায়িত্ববোধ। 

কারণ একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে কেবল বড় বড় পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়; বরং মানুষের ছোট ছোট ভালো অভ্যাসের সমষ্টিতেই। আসুন, ইসলামের পরিমিতিবোধ ও মানবিক শিক্ষাকে ধারণ করে শব্দদূষণমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য সমাজ গঠনে সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি।

লেখক : 
আলেম ও প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   শব্দদূষণ  আধুনিক সমস্যা  ইসলামি সমাধান  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: