চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ড (ডিপি ওয়ার্ল্ড)। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির পর এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ায় অর্থনৈতিক সুফল, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, বন্দরের কর্তৃত্ব এবং চুক্তির অপ্রকাশিত বিষয় নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
তবে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বিশেষ করে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা চুক্তিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আমদানি-রফতানিতে সময়ক্ষেপণ, হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের মতো সমস্যাগুলো কমবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের আশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দর সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ‘বাণিজ্যিক হাবে’ পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
এদিকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার পর বন্দরে, আশপাশের এলাকায় বা চট্টগ্রামে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর।
নির্দেশ পেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ ওই অঞ্চলের সংসদ সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও দলীয় সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। চট্টগ্রামের এক সংসদ সদস্যও নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন নির্দেশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বন্দর হবে আন্তর্জাতিক মানের
বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ায় দুবাই-সিঙ্গাপুরের কাতারে শামিল হবে চট্টগ্রাম বন্দর। এনসিটিতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই অর্থ দিয়ে এনসিটির ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ করা হবে।
ফলে বন্দরে আগে যে কাজ ৩ দিনে হতো, সেটি এক দিনে নামবে। এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে স্মার্ট বন্দরের যাত্রা শুরু হবে চট্টগ্রামের। এনসিটিকে বিশ্বমানে বদলে দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ৪৪ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ হবে এনসিটির সক্ষমতা। এর ফলে আমদানি-রফতানি ব্যয় কমবে ৩০ শতাংশের মতো। বন্দরের আয় বাড়বে ২০০ কোটি টাকার মতো।
মাদার ভেসেল আসবে চট্টগ্রামে, সিঙ্গাপুর-কলম্বো নির্ভরতা কমবে এবং সিন্ডিকেটমুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দর। কেন না এনসিটিতে স্বচ্ছতা আনবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এভাবে কলম্বো-করাচির পর চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার হাব হয়ে উঠবে। কারণ ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক ৮২টি টার্মিনালের অভিজ্ঞতা আসবে চট্টগ্রাম বন্দরে।
চুক্তির আগে-পরে বন্দরের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের কর্মহীন হওয়ার বিষয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের মত— জমি-জেটি সব বন্দরেরই থাকবে, শুধু পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড— কাজেই নিরাপত্তাহীনতার কোনো শঙ্কা থাকছে না। আর চুক্তির ফলে একজন শ্রমিকও চাকরি হারাবে না। কারণ ৯০ শতাংশ দেশীয় জনবল রাখার শর্তে এনসিটি চুক্তি করা হয়েছে। তা ছাড়া এর নিরাপত্তা থাকবে নৌবাহিনী ও বন্দরের হাতে। সুতরাং বন্দরের মালিকানা হারাচ্ছে না বাংলাদেশ।
উচ্ছ্বসিত ব্যবসায়ীরা
ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির পর তারা আশা করছেন, এতে পণ্য খালাস এবং রফতানিতে সময় ও ব্যয় কমবে, বন্দরে হয়রানি হ্রাস পাবে এবং কার্যক্রমে গতি আসবে।
সরকারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ায় তিনি একজন ব্যবসায়ী ও রফতানিকারক হিসেবে উচ্ছ্বসিত। এতে রফতানিতে সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বন্দরে হয়রানি এবং ঘুষের প্রকোপ কমবে বলে তিনি আশা করেন।
হাতেম বলেন, এর আগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বন্দরে পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকায় ডিপি ওয়ার্ল্ডও এনসিটি পরিচালনায় সফল হবে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, সরকারের এ সিদ্ধান্তে বন্দরের কার্যক্রম ও আমদানি-রফতানিতে গতি আসবে এবং দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতাকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপারেটরের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ নেওয়া উচিত। যৌক্তিক দাবি থাকলে তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উত্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ট্রেড বডিও এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে। তবে অযথা বিরোধিতা করে সরকারের উদ্যোগ ব্যাহত না করার আহ্বান জানান তিনি।
চুক্তি অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ২০ ফুট সমপরিমাণ কনটেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় রাজস্বের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব অংশ বা রয়্যালটি পাবে চট্টগ্রাম বন্দর। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
চুক্তিতে বছরে কমপক্ষে ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এ ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের কথা বলেছেন ব্যবসায়ী নেতা চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে সামনের সারিতে যে ক’টি বন্দর অপারেটর রয়েছে, তাদের মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড অন্যতম।
দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গত ১০ বছরে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক পোর্ট অপারেটর হিসেবে নিজেদের হাজির করেছে। দুবাই পোর্ট (ডিপি) নিজেরাই রিজিওনাল লজিস্টিক হাব হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে। ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশেও কয়েকটি বন্দরের টার্মিনাল বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ড অপারেট করছে। আমরা নিজেরাই দেখছি তারা ওইসব বন্দর সুনামের সঙ্গে পরিচালনা করছে। আমরা চাই এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান যে উৎপাদনশীলতা রয়েছে, তা আরও বাড়াতে হবে। তারা সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আধুনিক টেকনোলজি নিয়ে আসবে। তারা এনসিটি এমনভাবে অপারেট করুক, যাতে বিশ্বের আরও নামকরা অপারেটররা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ইতিবাচক হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত চট্টগ্রামের বাদশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চট্টগ্রাম চেম্বার ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত পরিচালক শফিউল আলম বাদশা। এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি পরিচালনা করলে আমাদের (চট্টগ্রাম বন্দরের) কোনো লোকসান নেই। আমাদের এক টাকাও নতুন করে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। উল্টো তারা আমাদের ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম দেবে। এর আগে যারা অপারেট করত তারা তো কোনো বিনিয়োগ করেনি। বন্দর নিজের টাকায় যন্ত্রপাতি সংযোজন করেছিল। যারা অপারেটর ছিল তারা লোকবল দিয়ে সেই যন্ত্রপাতি অপারেশন করেছে। এখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল নতুন করে না বানালেও নতুন যন্ত্রপাতি নিয়ে আসবে। বন্দর অপারেশনের অনেক জটিলতা ও অনিয়ম কমে আসবে, বন্দরের গতি বাড়বে। এতে বন্দরের সঙ্গে দেশও লাভবান হবে।’
আমদানিকারক ব্যবসায়ী বাংলাদেশ নন-প্যাকার্স ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুব রানা বলেন, বন্দর অপারেশনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিশ্বের ৮০টির মতো বন্দর ও টার্মিনাল অপারেশন করছে তারা। উন্নত বিশ্বের দেশে ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও তারা বন্দর অপারেশন করছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর জেবল আলিও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় অপারেশনাল হাব।
ডিপি ওয়ার্ল্ড কাজ শুরু করলে সামনের দিনগুলোতে বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসবে। এতে বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি অনেকাংশে বেড়ে যাবে। তারা নির্ধারিত সময়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার যেমন নামাবে, তেমনি নির্ধারিত সময়ে কনটেইনার জাহাজীকরণ করতে সক্ষম হবে। এতে বন্দরের গতি আরও অনেক বাড়বে।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বিশ্বখ্যাত টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার বিষয়টিকে ঢাকা চেম্বার ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন নিশ্চিত হতে পারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়বে এবং জাহাজের ‘টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম’ কমবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে দক্ষ ও পেশাদার অপারেটর আমরা চাই। এতে সময় কমবে, ব্যবসার খরচও কমার কথা। কিন্তু যদি চার্জই ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়, তাহলে ব্যবসার খরচ কমবে কীভাবে?’
বিশ্বজুড়ে ৮০টির বেশি বন্দর পরিচালনা করে ডিপি ওয়ার্ল্ড
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী ৮০টির বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে। লজিস্টিকস হাব ও অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ৮৪টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অংশগ্রহণ রয়েছে। বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে তারা।
এশিয়া-প্যাসিফিক ও দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। ভারতের মুম্বাইয়ের নাভা শেভা, চেন্নাই, কোচিন, মুন্দ্রা ও বিশাখাপত্তনম বন্দর ছাড়াও চীন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বন্দর পরিচালনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি।
ইউরোপে লন্ডনের গেটওয়ে ও সাউদাম্পটনসহ বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প, নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম এবং ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সাইপ্রাস, রোমানিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন ও সুইডেনের বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনালে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রধান হাব। দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর প্রতিষ্ঠানটির ফ্ল্যাগশিপ টার্মিনাল। সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্টও পরিচালনা করে তারা। আফ্রিকায় মিসর, আলজেরিয়া, সেনেগাল, সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, রুয়ান্ডা ও তানজানিয়ার দার এস সালাম বন্দরের কার্যক্রমেও যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া উত্তর আমেরিকার কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ও প্রিন্স রুপার্ট, দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর ক্যালাও, ব্রাজিলের সান্তোস ও আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস বন্দরসহ চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, পানামা, সুরিনাম ও ডোমিনিকান রিপাবলিকে বন্দর পরিচালনায় অংশগ্রহণ রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের।
চুক্তিতে কী আছে
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছর পরিচালনা করবে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড। দুই পক্ষের সম্মতিতে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৪৪ শতাংশ এ টার্মিনাল দিয়ে হয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে পরিচালনার অধিকার ও দুই পক্ষের দায়বদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, পরিবেশ ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা, ন্যূনতম সেবার মান, মাশুল এবং সম্পদের মালিকানার বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া মেয়াদ ও নবায়ন, জেটির সামনের খননকাজ, দৈবদুর্বিপাক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চুক্তি বাতিল ও ক্ষতিপূরণ, বন্দর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ, গোপনীয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং হস্তান্তরের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।
টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বন্দরকে এককালীন ৫ কোটি ডলার দেবে। এই অর্থের ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের দিন এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনাল বুঝিয়ে দেওয়ার আগে পরিশোধ করার কথা।
এ ধরনের কনসেশন চুক্তির পুরোটা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয় বলে তাদের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির কোন ধারা প্রকাশ করা হবে, তা নির্ধারণ করে।
শ্রমিক-কর্মচারীরা কি চাকরি হারাবেন?
সরকারের বক্তব্য, কেউ চাকরি হারাবেন না। নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরিচ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বরং টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও অটোমেশন প্রতিষ্ঠিত হলে উল্টো আরও চাকরির সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে। বন্দরে যখন আরও দক্ষতার সঙ্গে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হবে, তখন আরও জনবলের প্রয়োজন হবে।
ফলে কোনো শ্রমিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির সুস্পষ্ট শর্ত অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে নতুন পরিচালন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাস্তবে কর্মীদের নিয়োগ, দায়িত্ব ও সুবিধার কী পরিবর্তন হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত এবং বাস্তবায়নের ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক বন্দরই বিদেশিদের হাতে
দক্ষিণ এশিয়ার বড় বন্দরগুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের দক্ষিণ টার্মিনাল ৩৫ বছরের জন্য চীনের মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসকে এবং পশ্চিম টার্মিনাল একই মেয়াদে ভারতের আদানি পোর্টস ও জন কিলসকে দেওয়া হয়েছে। দেশটির হাম্বানটোটা বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব ৯৯ বছরের জন্য চীনের চায়না মার্চেন্টস পোর্টের হাতে।
ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দরের দুটি টার্মিনাল ৩০ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে। একই বন্দরের এপিএম টার্মিনালও ৩০ বছরের চুক্তিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় রয়েছে। মুন্দ্রা বন্দরের একটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে সুইজারল্যান্ডের এমএসসি। চেন্নাই, কোচিন ও তুতিকোরিন বন্দরের পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ও ডিপি ওয়ার্ল্ড।
পাকিস্তানের করাচি বন্দর ২৫ বছরের জন্য হংকংয়ের হাচিসন পোর্টকে, কাসিম বন্দর ২৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এবং গোয়াদর বন্দর ৪০ বছরের জন্য চীনের চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের পরিচালনায় রয়েছে। এবার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে