ইসলামে জাদুটোনা করা, শেখা কিংবা এর মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জাদুর অনিষ্ট থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তাই জাদুটোনা ও অন্যান্য অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা পেতে একজন মুসলমানের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, নিয়মিত ইবাদত করা এবং কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া ও আমল অনুসরণ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে জাদু অন্যতম। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।’ এরপর তিনি আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, জাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং সতী-সাধ্বী মুমিন নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬; হাদিস নম্বর সংস্করণভেদে ভিন্ন হতে পারে।)
জাদুটোনা ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত যেসব আমল করা যায়, সেগুলো হলো—
১. সকাল-সন্ধ্যায় তিন কুল পাঠ
সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস নিয়মিত তিলাওয়াত করা সুন্নাহসম্মত আমল। সকাল ও সন্ধ্যায় প্রতিটি সুরা তিনবার করে পড়ার কথা হাদিসে এসেছে। বিশেষ করে সুরা ফালাক ও সুরা নাসে বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রাতে ঘুমানোর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনটি সুরা পড়ে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিতেন এবং শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছে নিতেন। তিনি এভাবে তিনবার করতেন। (সহিহ বুখারি)
২. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি। ঘুমানোর আগে এ আয়াত পাঠের বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় এসেছে, রাতে আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে হেফাজতকারী থাকে এবং শয়তান কাছে আসতে পারে না।
তাই নিয়মিত ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করা যেতে পারে।
৩. সুরা বাকারার তিলাওয়াত
সুরা বাকারার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এ সুরা পাঠ করা বরকতের বিষয় এবং তা পরিত্যাগ করা অনুতাপের কারণ। যে ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান দূরে সরে যায়। (সহিহ মুসলিম)
তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সুরা বাকারার তিলাওয়াত করা এবং এর শিক্ষা অনুসারে জীবন পরিচালনা করা উত্তম।
৪. অসুস্থতা ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো একটি দোয়া হলো—
আরবি : بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ
উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি আরকিকা, মিন কুল্লি শাইইন ইউজিকা, ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরকিকা।
অর্থ: আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি—যে বিষয় আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট এবং হিংসুকের চোখের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি। (সহিহ মুসলিম : ২১৮৬)
এ দোয়াটি অসুস্থতা ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা এবং আরোগ্যের জন্য পড়া যায়।
৫. সুরা ফাতিহা পাঠ
সুরা ফাতিহা পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরা। হাদিসে এ সুরা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাই অসুস্থতা বা কষ্টের সময় আল্লাহর কাছে আরোগ্য ও সাহায্য চেয়ে সুরা ফাতিহা পাঠ করা যায়।
৬. নিয়মিত নামাজ ও আল্লাহর জিকির
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া এবং আল্লাহর জিকির একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপদ-আপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত।
জাদুটোনা থেকে বাঁচার কথা বলে কেউ অর্থ দাবি করলে বা ভয় দেখিয়ে তাবিজ, অজানা মন্ত্র কিংবা শরিয়তবিরোধী কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করতে বললে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, এসব আমল আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া ও ইবাদতের অংশ। কোনো আমলকে সব ধরনের বিপদ থেকে নিশ্চিত সুরক্ষার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, সৎকাজ করা এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলা।