হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড নেই, সংক্রমণের ঝুঁকিতে সাধারণ রোগীরাও

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধায় ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এই জেলার ডেঙ্গু চিকিৎসার প্রধান ভরসা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে

2026-10-11T09:01:06+00:00
2026-10-11T09:01:06+00:00
 
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড নেই, সংক্রমণের ঝুঁকিতে সাধারণ রোগীরাও
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:০১ এএম 
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের বারান্দার চিত্র। ছবি : সময়ের আলো
উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধায় ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এই জেলার ডেঙ্গু চিকিৎসার প্রধান ভরসা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য কোনো পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড বা নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত ও অন্য রোগের রোগীরা একই ওয়ার্ডে পাশাপাশি শয্যায়, বারান্দার সংকীর্ণ মেঝেতে এবং সিঁড়ির নিচে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতি রোগীর সঙ্গে দু-তিনজন স্বজন থাকায় ভিড় আরও বেড়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, মৌসুমের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুধু সরকারি হাসপাতালেই ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩১০ জন। নথিভুক্ত মৃত্যু একটি। সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান জানান, জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলিয়ে এখন ভর্তি ৪৫ জন। যাঁদের ২৫ জন জেনারেল হাসপাতালে আছেন। বেসরকারি ক্লিনিক ও বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ধরলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা বহু গুণ বেশি হওয়ার কথা।

হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের একটি বড়ো অংশ কাজ বা পড়াশোনার জন্য ঢাকায় ছিলেন। সেখানে আক্রান্ত হয়ে তারা নিজ জেলায় ফিরেছেন। ঢাকার খিলক্ষেতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করা সত্তরোর্ধ্ব শাহাজাদা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ (২১)। কিন্তু গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে তাদের দুজনকে রাখা হয়েছে খোলা জায়গায়, সাধারণ রোগীদের পাশে।


ডেঙ্গু সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। এডিস মশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ের পরে অন্য কাউকে কামড়ালে তিনি সংক্রমিত হন। হাসপাতালে প্রতিটি শয্যায় মশারি থাকার কথা, কিন্তু পর্যাপ্ত মশারি নেই। যেগুলো আছে জায়গার অভাবে সেগুলোও টানানো যাচ্ছে না। শিক্ষার্থী আসিফ জানান, ভর্তির দিন থেকে বিছানা পাননি, মশারিও দেওয়া হয়নি। দোতলার বারান্দায় ডেঙ্গু রোগী বৃষ্টি বেগমের (২২) পাশে মশারি গুছিয়ে রাখা, টানানো হয়নি। হার্টের রোগী আশরাফুল আলম লেবুর পাশেই চার ডেঙ্গু রোগী, তিনজনের মশারি নেই। মশারিহীন অবস্থায় ডেঙ্গু রোগীর পাশে থাকা সুস্থ মানুষ ও অন্য রোগীরা তাই সরাসরি ঝুঁকিতে। প্রতিদিন ১৪ থেকে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই জায়গায় থাকছেন।

সরকারি নথিতে হাসপাতালটি ৫০ থেকে ধাপে ধাপে ১০০, ২০০ ও শেষে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। বাস্তবে ভৌত অবকাঠামো এখনো ৫০ শয্যার পুরোনো ভবনেই আটকে। নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের ছয় বছর পার হলেও আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতায় তা পুরোপুরি চালু হয়নি। আরএমও ডা. আসিফ-উর রহমান বলেন, এ কারণেই ইচ্ছা থাকলেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা যাচ্ছে না।

প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো রোগী ভর্তি থাকেন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার আট থেকে নয় গুণ চাপ। বাড়তি রোগীদের জায়গা হচ্ছে বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতে। নার্সিং ইনচার্জ বীণাপাণি গোলজার বলেন, ‘৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি পাঁচ শতাধিক। তাহলে কীভাবে শৃঙ্খলা থাকবে?’ বিছানা ছাড়া রোগীদের মশারি দেওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে তিনি সংক্রমণের ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেন।

জনবল সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সহকারী সার্জনের ২৮টি পদের ২৩টি শূন্য, ঘাটতি ৮২ শতাংশের বেশি। জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তার (ইএমও) আটটি পদে কর্মরত আছেন একজন, সাতটি শূন্য। সার্জারি, মেডিসিন, অ্যানেসথেসিয়া, নাক-কান-গলা ও চক্ষু বিভাগেও পর্যাপ্ত কনসালট্যান্ট নেই। অর্থো-সার্জারি কোনো চিকিৎসক নেই। ফলে এত রোগীর চিকিৎসার দায় এসে পড়েছে হাতে গোনা নার্সদের ওপর। সিনিয়র স্টাফ নার্স ইমিলি বেগম বলেন, ‘আমরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। নার্সরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’

গাইবান্ধা সদরের ধানঘড়া থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী আজমল হোসেন বলেন, বেড খালি না থাকায় তাঁকে খোলা বারান্দার নোংরা মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। জটিলতা দেখা দিলে নার্সদের ডেকেও পাশে পাওয়া যায় না। পূর্ব কোমরনই থেকে আসা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সরকারি সেবার নামে হয়রানি চলছে। তার ভাষায়, পরিবেশ এত দুর্গন্ধময় যে সুস্থ মানুষও এখানে এলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। শহরের কণা আকতারের ছোট শিশু পেটের তীব্র ব্যথা নিয়ে ভর্তি। তিনি জানান, ডাক্তার নেই, নার্সকে অন্তত ১০ বার ডাকলে একবার দেখা মেলে।

রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে সরবরাহ থাকার পরও বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। প্লাটিলেট কাউন্ট ও এনএস১-এর মতো মৌলিক পরীক্ষাও করাতে হচ্ছে বাইরের ল্যাবে। এতে দরিদ্র রোগীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে এবং চিকিৎসা পিছিয়ে যাচ্ছে।


চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির তনু এই পরিস্থিতির জন্য হাসপাতালের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে বড়ো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ তার দাবি, হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক অন্য একটি সরকারি হাসপাতালে অনিয়মের কারণে ওএসডি হয়ে গাইবান্ধায় এসেছেন। সেবার মান বাড়ানোর বদলে তিনি টেন্ডার বাণিজ্য ও নিজস্ব সিন্ডিকেট নিয়ে ব্যস্ত বলে অভিযোগ করেন তনু। এসব অভিযোগ সম্পর্কে হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে আরএমও তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এই প্রশাসনিক চাপ তিনি নিতে পারবেন না। তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহিদুল্লাহকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ওপর থেকে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় নিষেধ আছে।’ দ্বিতীয় প্রশ্নের পর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে কক্ষ ছেড়ে যান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় ও ১২ দফা জরুরি নির্দেশনায় বলা আছে, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড রাখতে হবে। প্রতিটি শয্যায় মশারি নিশ্চিত করতে হবে, চত্বর পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং জরুরি পরীক্ষা ও ওষুধ বিনামূল্যে দিতে হবে। গাইবান্ধায় প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিত্র উল্টো।

হাসপাতালের বাইরের পরিবেশও নোংরা। ড্রেন ও নালায় জমে থাকা পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কয়েক মাস ধরে চত্বর পরিষ্কার হয়নি বলে অভিযোগ। জমা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

সংকট কাটাতে সবার আগে দরকার ছয় বছর ধরে অব্যবহৃত নতুন ভবনটি আসবাব ও সরঞ্জাম দিয়ে চালু করা। ডেঙ্গু রোগীদের পৃথক ইউনিটে নিতে হবে, প্রতিটি শয্যায় মশারি বাধ্যতামূলক করতে হবে। শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তদারকি, কমিশন বাণিজ্যের তদন্ত এবং হাসপাতালেই বিনামূল্যে ওষুধ ও পরীক্ষার ব্যবস্থাও জরুরি।

যে হাসপাতাল মানুষকে সুস্থ করার জায়গা, সেটিই যদি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   হাসপাতাল  ডেঙ্গু ওয়ার্ড  সংক্রমণ  ঝুঁকি  সাধারণ রোগীরা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: