শপিংমলে বড় করে লেখা ‘৭০ শতাংশ ছাড়’, অনলাইন কেনাকাটায় ‘ফ্ল্যাশ সেল’ কিংবা ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে ‘ধামাকা অফার’-এ ধরনের প্রচারণা দেখলে অনেক সময় প্রয়োজন না থাকলেও কিছু একটা কিনতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয়, ছাড়ে পণ্য কিনে বুঝি অনেক টাকা বাঁচানো গেল। প্রশ্ন হলো, এতে কি সত্যিই সাশ্রয় হয়? নাকি বিশেষ কিছু মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া আমাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় উৎসাহিত করে? ছাড় দেখলে কেন কেনাকাটার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
ডোপামিনের আনন্দ : কেনাকাটায় জয়ের অনুভূতি
ছাড়ে পণ্য কেনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ নিয়ে ভোক্তা-মনোবিজ্ঞান ও নিউরোমার্কেটিংয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। ২০০৭ সালে স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি ও কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় কার্যকরী চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেনাকাটার সময় মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এ ধরনের গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো পণ্য কেনার সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার ও আনন্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশগুলো সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে নিউক্লিয়াস অ্যাকামবেনস আনন্দ ও পুরস্কার-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রত্যাশিত পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতিতে ডোপামিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ধরুন, একটি জামা কেনার কোনো পরিকল্পনাই আপনার ছিল না। হঠাৎ দেখলেন, দুই হাজার টাকার জামা পাওয়া যাচ্ছে এক হাজার টাকায়। তখন জামাটির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনার চেয়ে অর্ধেক দামে পাওয়ার সুযোগটি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে আনন্দের উৎস শুধু জামাটি নয়, বরং কম দামে পণ্যটি কিনে ভালো একটি সুযোগ কাজে লাগানোর অনুভূতিও। অর্থাৎ, প্রয়োজনের কারণে কেনাকাটার বদলে ছাড় পাওয়ার আনন্দই সিদ্ধান্তকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
অ্যাঙ্করিং ইফেক্ট : বেশি দাম দেখিয়ে সস্তার অনুভূতি
ছাড়ের প্রতি আকর্ষণের আরেকটি কারণ হলো ‘অ্যাঙ্করিং বায়াস’ বা মূল্যের নোঙর প্রভাব। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেমান ও আমোস টভারস্কির গবেষণায় মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাথমিক তথ্যের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো পণ্যের দাম সম্পর্কে প্রথম পাওয়া তথ্য পরবর্তী মূল্যায়নকে প্রভাবিত করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি ঘড়ির গায়ে প্রথমে পাঁচ হাজার টাকা দাম লেখা রয়েছে। পরে সেই দাম কেটে দুই হাজার টাকা করা হলো। তখন ক্রেতার মনে হতে পারে, তিন হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে ঘড়িটির মান, প্রয়োজনীয়তা কিংবা দুই হাজার টাকা তার জন্য যুক্তিসংগত কি না, সেসব বিবেচনা গুরুত্ব হারাতে পারে। অথচ পণ্যটির প্রকৃত বাজারমূল্য কিংবা আগের দাম সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে কতটা সাশ্রয় হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে আগের দামকে তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেই পণ্যটিকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।
সুযোগ হারানোর ভয় : ফোমো ও ক্ষতিভীতি
‘অফার শেষ হতে আর মাত্র এক ঘণ্টা’, ‘স্টক শেষ হওয়ার আগেই কিনুন’ কিংবা ‘আর মাত্র তিন জোড়া বাকি’-এ ধরনের বার্তা ক্রেতার মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘ফোমো’ (ফিয়ার অব মিসিং আউট), অর্থাৎ কোনো সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়। মনোবিজ্ঞানে ‘লস অ্যাভারশন’ বা ক্ষতিভীতি বলতে বোঝায়, একই পরিমাণ লাভ পাওয়ার আনন্দের তুলনায় সমপরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা অনেক সময় মানুষের সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলে।
ধরা যাক, অনলাইনে একটি কানের দুল পছন্দ হলো। পণ্যের পাশে লেখা, ‘আর মাত্র দুই জোড়া বাকি।’ তখন মনে হতে পারে, এখনই না কিনলে পরে আর পাওয়া যাবে না। এই তাড়না থেকে অনেকেই দাম, মান কিংবা প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই অর্ডার দিয়ে বসেন।
‘ফ্রি’ লেখা থাকলেই কি লাভ?
‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ কিংবা ‘বিনামূল্যে ডেলিভারি’-এ ধরনের অফারও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। বিনা মূল্যে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা মানুষের কাছে বিশেষভাবে আনন্দদায়ক মনে হতে পারে। ফলে, পণ্যটির প্রকৃত প্রয়োজন বা মোট খরচের হিসাব অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
যেমন, একটি পণ্য কেনার সঙ্গে বিনামূল্যে আরেকটি পণ্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় পণ্যটি আদৌ প্রয়োজন কি না, তা না ভেবেই কেউ অফারটি গ্রহণ করতে পারেন। আবার বিনামূল্যে ডেলিভারির সুবিধা পেতে অপ্রয়োজনীয় আরও পণ্য কেনার ঘটনাও ঘটতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো কিছু ‘ফ্রি’ হলেই যে সামগ্রিকভাবে খরচ কমবে, এমন নয়। কেনাকাটার আগে মোট ব্যয় ও পণ্যের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পণ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেটি কেনার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। কোনো পণ্য নিয়ে একের পর এক পোস্ট, ভিডিও কিংবা ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া দেখলে সেটি কেনার ইচ্ছা তৈরি হয় অনেকেরই। অন্যরা কিনছেন বা ব্যবহার করছেন- এমন দৃশ্যও মানুষকে প্রভাবিত করে। পণ্যটি নিজের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্নটি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।
কোনো অফার চোখে পড়লেই কেনার সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন- ছাড় না থাকলেও কি পণ্যটি কিনতাম? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে কেনাকাটার আগে আরেকবার ভাবুন। এতে আপনি হয়ত অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়াতে পারবেন।
সময়ের আলো/মহু