দুই মাসের বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালের কর্মচারীদের একাংশ সিভিল সার্জন কার্যালয় অবরোধ করে বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে প্রধান সহকারী সুবাস দাশের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটে। একই দিন বেতনের ফাইলে স্বাক্ষর না হলে মঙ্গলবার থেকে হাসপাতালের সব সেবা বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন ও বেতন-ভাতার ফাইলে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, সোমবার সকালে তারা নিজ নিজ কক্ষে দাফতরিক কাজ করছিলেন। এ সময় সুবাস দাশের নেতৃত্বে সদর হাসপাতালের একদল কর্মচারী কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন। কয়েকজন নারী কর্মচারী তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ছাড়া, অবরুদ্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সংবাদকর্মীদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সুবাস দাশ জানান, গত দুমাস ধরে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি সহকারী সিভিল সার্জনকে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, কয়েক দিন পর তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমা। এ অবস্থায় বেতন ও বোনাস না পেলে পরিবার নিয়ে উৎসব উদযাপন করা কঠিন হয়ে পড়বে। সোমবারের মধ্যে সব কর্মচারীর বেতনের ফাইলে স্বাক্ষর না হলে মঙ্গলবার থেকে হাসপাতালের সব সেবা বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাবেন তারা।
বান্দরবানের ডেপুটি সিভিল সার্জন চিকিৎসক দিলীপ কুমার দেবনাথ জানান, সিভিল সার্জনের অনুপস্থিতিতে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা তার ছিল না। এ কারণে বেতনের ফাইলে স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী, বিভাগীয় পরিচালকের নির্দেশনা ছাড়া সিভিল সার্জনের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি সিভিল সার্জন সব ধরনের দাফতরিক নথিতে স্বাক্ষর করতে পারলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করতে পারেন না। বিষয়টি লিখিতভাবে বিভাগীয় প্রধানকে জানানো হয়েছে। লিখিত অনুমতি পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ততদিন সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আহ্বায়ক লুলাইমং মারমা বলেন, ‘জেলা সদর হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহের দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজালা লুসাই বর্তমান সিভিল সার্জন চিকিৎসক মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরীকে অপসারণ করে চিকিৎসক দিলীপ কুমার দেবনাথকে ডেপুটি সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চিকিৎসক শাহীন হোসাইন চৌধুরীকে পুনরায় সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে, জেলা পরিষদ তার যোগদান গ্রহণ না করায় দাফতরিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবেই কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে রয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক চিকিৎসক শেখ ফজলে রাব্বি জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া চিকিৎসক শাহীন হোসাইন চৌধুরীর যোগদান জেলা পরিষদ গ্রহণ না করায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার বান্দরবান সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ডেপুটি সিভিল সার্জনের পাঠানো চিঠি তিনি পেয়েছেন। জেলা পরিষদের পাঠানো চিঠিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই এর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ততদিন সবাইকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার আহ্বান জানান।
এদিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সদর হাসপাতালের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নার্স ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা প্রথমে দাফতরিক জটিলতার বিষয়টি জানতেন না। ডেপুটি সিভিল সার্জনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পর বিষয়টি জানতে পেরেছেন।
তাদের ভাষ্য, প্রধান সহকারী সুবাস দাশ বিষয়টি তাদের অন্যভাবে বুঝিয়েছিলেন। সে কারণে তারা হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তালা দিতে যান। তবে, প্রকৃত পরিস্থিতি জানার পর তাদের অনেকেই আর অবরোধ বা কর্মবিরতিতে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/মহু