ফেরাউনের কথা মনে হলেই, আমাদের চোখে যে দেশটির ছবি ভেসে ওঠে, সেটি হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মিসর। এটি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া জুড়ে অবস্থিত একটি আন্তঃমহাদেশীয় দেশ। প্রতি বছর অনেক পর্যটক দেশটিতে আসেন, বহু প্রাচীন স্থাপনা ঘুরে দেখেন ও এর আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ নেন।
আসওয়ান বাঁধ
১৯৬০ সালে নীল নদের ওপরে নির্মিত এ বাঁধটি সেসময় ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মাটির বাঁধ। এখান থেকে নীল নদের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
ফিলায়ে মন্দির
চার হাজার বছরের পুরনো এ মন্দির একটি দ্বীপের ভেতর অবস্থিত। তাই এখানে যেতে হয় জলপথে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ফারাও নিদর্শন। দুহাজার বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া ফারাওদের ভাষা হায়ারোগ্লিফিক ও ফারাও সম্রাজ্ঞীদের অবয়ব অঙ্কিত আছে স্থাপনাগুলোর দেয়ালে। লেক নাসেরে অবস্থিত এ দ্বীপ থেকে চারপাশে তাকালে হাজার হাজার বছর আগে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া অনেক পাথর দেখা যায় এবং দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে আসওয়ান বাঁধও।
স্ফিংস
স্ফিংস এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক পাথরের মূর্তি। এ মূর্তিটি সূর্যোদয়ের দিকে মুখ করে নির্মিত। এটিই একমাত্র স্থাপনা, যার গায়ে কোনোকিছু লেখা নেই। তাই জানা যায় না, কে এই বিশ্বখ্যাত মূর্তি তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ভ্যালি টেম্পল
ভ্যালি টেম্পল বা মন্দিরের উপত্যকা নামে খ্যাত জায়গাটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মধ্যে একটি। ১৩০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই উপত্যকায় মোট সাতটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
প্যাপিরাস ইনস্টিটিউট
প্যাপিরাস উদ্ভিদ থেকে প্রাচীনকালে কীভাবে কাগজ বানানো হতো, লেখা হতো, তার পৃষ্ঠায় ছবি আঁকা হতো, এসব একদম কাছ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে প্যাপিরাস ইনস্টিটিউটে। এই ইনস্টিউটটিতে প্যাপিরাসে আঁকা চিত্রকর্মের বেশ বড় সংগ্রহ রয়েছে।
কায়েদ বাই কেল্লা
এ কেল্লার তিন দিকেই রয়েছে ভূমধ্যসাগর। এখান থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার সমুদ্র বন্দর দেখা যায়। একসময় এখানেই ছিলো আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইট হাউস। এই আত্মরক্ষামূলক দুর্গটি প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের ভেতর একটি ছিলো।
আবু আল আব্বাস আল মুরসি মসজিদ
ইতালির নকশা করা গ্রানাইট, ব্রোঞ্জের ঝাড়বাতি, মিম্বরের শীর্ষে ফরাসি সোনা দিয়ে লেখা কোরআনের আয়াত থেকে শুরু করে ১৫ শতাব্দীতে নির্মিত এ মসজিদের পুরো নির্মাণশৈলীই অসাধারণ।
মোনতাজা প্রাসাদ
সুবিশাল দৃষ্টিনন্দিত বাগান নিয়ে তৈরি সমুদ্রতীরের এই প্রাসাদের প্রতিটি তলায় সমুদ্রের দিকে মুখ করে খোলা তোরণ বানানো হয়েছে। ১৫০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এ প্রাসাদে মুহাম্মদ আলী রাজবংশের পারিবারিক ইতিহাস ও শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা রয়েছে।
হাসিপসুত মন্দির
এটি মিসরের একমাত্র মন্দির, যার নামকরণ করা হয়েছে কোনো রাণীর নামে। মিসরে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাজত্ব করা রানি হাসিপসুতের সমাধিও রয়েছে মন্দিরের ভেতর।
রাজাদের উপত্যকা
এটি প্রাচীন মিসরের রাজন্যবর্গের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত প্রধান কবরস্থান। এই উপত্যকায় মোট ৬৩টি মন্দির রয়েছে। মন্দিরগুলোর নকশায় তৎকালীন মিসরীয় পুরাণের বিভিন্ন চরিত্রের ছবি আঁকা রয়েছে, যার থেকে সেই সময়কার বিশ্বাস ও মৃত্যু পরবর্তী বিভিন্ন সৎকার কর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে এই উপত্যকাটি ফারাও তুতাংখামুনের মমি আবিষ্কার ও তার সমাধিস্থ মন্দির ‘কেভি৬২-র’জন্য বিখ্যাত। কারণ, তুতাংখামুনের মমির মাধ্যমেই ফারাওদের অভিশাপের গল্প বিস্তৃতি লাভ করে।
মেমননের কলোসি
এটি ফেরাউন আমেনহোটেপ তৃতীয়ের দুটি বিশাল পাথরের মূর্তি। মূর্তিগুলিতে গ্রিক এবং ল্যাটিন ভাষায় ১০৭টি রোমান যুগের শিলালিপি রয়েছে, যা ২০ থেকে ২৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লেখা।
পিরামিড
পৃথিবীর অন্যতম এক বিস্ময়ের নাম মিসরের পিরামিড। মিশরে ১০০টিরও বেশি পিরামিড রয়েছে। পিরামিডগুলো তৈরি করা হতো ফারাওদের মৃতদেহ মমি করে সংরক্ষণের জন্য। ফারাওরা মনে করতেন, মৃত্যুর পরে তারা মৃতদের রাজা হবেন। তাই এত আয়োজন করে তাদের মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হতো। একটি পিরামিড থেকে আরেকটি পিরামিড যেন বেশি সুন্দর হয়, তা নিয়ে চলত ফারাওদের প্রতিযোগিতা।
কয়েক হাজার বছর আগে এত ভারী ভারী পাথর ব্যবহার করে সুবিশাল পিরামিড কীভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল, তা আজও এক বিস্ময়। পিরামিড তৈরিতে যেই বিশাল বিশাল পাথর ব্যবহৃত হতো, সেগুলো আনা হতো শত শত মাইল দূর থেকে। এত বছর পরেও পাথরগুলো কীভাবে একটি অপরটির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আছে, তা আরেক আশ্চর্যজনক ব্যাপার।
একবার এক সুলতান মিসর থেকে সব পিরামিড ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি অনেক শ্রমিক নিয়োগ করে টানা ৮ মাস চেষ্টা করেও কোনো পিরামিড ভাঙতে তো পারেনইনি, পিরামিডের বিশেষ কোনো ক্ষতিও করতে পারেননি। পরে তিনি তার এই কাজে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
মিসরের এই পিরামিডগুলোতে আছে অনেকগুলো চেম্বার, গোপন সুড়ঙ্গপথ। আজও গবেষকরা পিরামিডের অনেক রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি। গবেষণার ফলে জানা যায়, প্রতিটা পিরামিড তৈরি করা হতো নক্ষত্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এত বছর আগেও তাদের মাপজোখ, গণিতবিদ্যা কী ভীষণ নিখুঁত ছিল, তা সবাইকে অবাক করে।
সময়ের আলো/মহু