মিসর ভ্রমণে স্ক্যাম থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকতে হবে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
মিসর ভ্রমণে স্ক্যাম ও নানা ধরনের হয়রানি থেকে বাঁচতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরছি। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর থেকেই শুরু হতে পারে নানা ধরনের প্রতারণার চেষ্টা ও ভিক্ষা চাওয়া। শুধু তাই নয়, এয়ারপোর্টের বাইরে এসে বুঝতেই পারবেন না কী করবেন। আশেপাশের আর্মড ফোর্স, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখতে পেয়ে তাদের কাছে সাহায্যের জন্য তথ্য চাইতে গেলে, তারাও হাত পেতে আপনার কাছে ভিক্ষা চাওয়া শুরু করবে! যারা প্রথমবার মিসর ভ্রমণ করবেন, তারা যেন প্রতারিত না হন, সেজন্য কিছু বিষয় তুলে ধরলাম।
রেডিসন ব্লু প্লাজা হোটেল, মিসর। ছবি : সংগৃহীত
হোটেল বুকিং
আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে দেশটিতে থাকা-খাওয়া-ঘোরাফেরা অনেক সস্তা। নানা অ্যাপে দেখতে পাবেন, কায়রো ও গিজায় ৬-৭ ডলারে ব্রেকফাস্টসহ ডাবল বেডের বিশাল বড় রুম পাওয়া যায়। অনেকেই কম দাম দেখে গিজাতেই অগ্রিম হোটেল বুকিং করে যান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গিজায় পিরামিড ছাড়া দেখার মতো বিশেষ কিছুই নেই এবং সেখান থেকে যাতায়াত অনেক অসুবিধা। গিজা থেকে সিটি সেন্টারে সরাসরি কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই; তাই ট্যাক্সি নিতে হয়।
ট্রান্সপোর্ট বা যাতায়াত
বড় ধাক্কাটা খাবেন এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে যাওয়ার সময়। তখন এয়ারপোর্টে একেকটা ট্যাক্সি ১৫০০-২৫০০ পাউন্ড চাইবে। এটাই স্বাভাবিক- প্রত্যেক দেশের এয়ারপোর্টে ট্যাক্সির দাম বেশিই হয়। কিন্তু আপনি যদি একটু ধৈর্য ধরে সামান্য কিছু সময় ব্যয় করেন, তাহলে কায়রো এয়ারপোর্ট থেকেই ২০০-২৫০ পাউন্ডে ট্যাক্সি ম্যানেজ করতে পারবেন (যদি আপনার হোটেল ডাউনটাউন সিটি সেন্টারে হয়)।
কীভাবে এত কম টাকায় যাবেন? যদি আপনি দিনের বেলায় পৌঁছান, তবে গুগল ম্যাপে ডাউনটাউন যাওয়ার জন্য লোকাল ট্রান্সপোর্টের অপশন পাবেন। তবে আমি বলব, দিন-রাত যাই হোক ট্যাক্সিতেই যাবেন। কারণ, এয়ারপোর্ট থেকে ডাউনটাউনের দূরত্ব অনেক বেশি। আপনি এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সোজা টার্মিনাল ৩-এ যাবেন। সেখানে একটু কষ্ট করে হেঁটে গেলে শাটল বাস স্টপিং দেখতে পাবেন। সেখান থেকে শাটল বাসে উঠে পড়বেন, যা সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। বাসটা আপনাকে এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে এক্সিটে নিয়ে যাবে। আপনি একদম শেষ স্টপিংয়ে নেমে পড়বেন। সেখানে দাঁড়ালেই দেখবেন অনেক ট্যাক্সি এসে আপনাকে জিজ্ঞাসা করবে, কোথায় যাবেন। ডাউনটাউনে যেতে চাইলে একটু আগে এয়ারপোর্টে যারা ২০০০-২৫০০ চাচ্ছিল, এখানে আপনার কাছ থেকে ৪০০-৫০০ চাইবে। কিন্তু আপনি দামাদামি করে নেবেন, ২০০-২৫০ ম্যাক্সিমাম এই অ্যামাউন্ট বললেই তারা রাজি হবে।
এবার বলি, সিটিতে কীভাবে ঘুরবেন? আমি বলব, খুব বেশি জরুরি না হলে ট্যাক্সি এড়িয়ে চলবেন এবং লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করবেন। মেট্রোতে সিঙ্গেল জার্নির জন্য মাত্র ১০ পাউন্ড নেয়! এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য অনেক লোকাল বাস পাবেন, যার ভাড়া ৯-২০ পাউন্ড। আবার অনেক জায়গায় দেখবেন, আমাদের দেশের টেম্পুর মতো মাইক্রোবাস আছে (শেয়ারিং)। এগুলোর ভাড়া ৫-১০ পাউন্ড হয়, কিন্তু আপনাকে বিদেশি দেখে ১৫-২০ চাইবে। তবে, ৫ পাউন্ড দিলেই হয়। এছাড়া, এক সিটি থেকে অন্য সিটি যেতে হলে বাসে যেতে পারেন। অনলাইনে টিকিট পাওয়া যায় এবং ভাড়াও অনেক সস্তা।
মিসরীয় খাবার। ছবি : সংগৃহীত
খাবার
সস্তায় মজার মজার খাবারের জন্য বারবার মিসর যেতে ইচ্ছে করবে। এই দেশের খাবার আসলেই অনেক সস্তা, কিন্তু যেসব রেস্টুরেন্ট বা ফুড শপে মেনু নেই, সেখানে আপনার কাছে ডাবল প্রাইস চাইবে। তারপরও তা আপনার কাছে সস্তাই মনে হবে, তবুও দাম সবসময় অর্ধেক বলবেন।
মনে করুন, সকালে একটা মুদির দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনলেন ১০ পাউন্ড দিয়ে, একই দোকানে বিকেলে আপনার কাছে সেটা ২৫ পাউন্ড চাইবে! তাই যাই কিনুন না কেন, দামাদামি করে কিনবেন।
মিসরের স্ট্রিট ফুডগুলো অনেক মজার হয়। প্রতি মোড়ে মোড়ে সতেজ ফল ও জুসের দোকান দেখতে পাবেন এখানে, নানা রকম ফল কেটে ফ্রিজে সাজিয়ে রাখে। এগুলোর জন্য ১৫-২০ পাউন্ডের বেশি দেবেন না। সবচেয়ে পছন্দের আইটেম হলো, ধাবা স্টাইল রেস্টুরেন্ট (এলাকাভিত্তিক)। সেখানে রুটি ও নানা পদের অ্যারাবিক আইটেম দিয়ে একটা প্ল্যাটার দেয়, যেখানে হোমস, ফেলাফেল, নানা ধরনের সালাদ, ডিমসহ অনেক আইটেম থাকে এবং রুটি আনলিমিটেড- অর্থাৎ, যত খেতে পারেন! এগুলো একেক দোকানে একেক দাম, আমি সর্বোচ্চ খেয়েছি ৫০ পাউন্ডে, আবার একই খাবার একটু খোলা জায়গায় খেয়েছি ২০ পাউন্ডে!
এছাড়া ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে মেনু থাকে। তারপরও খাবার অর্ডার দেওয়ার আগে ভালো করে কাউন্টারে বসা ম্যানেজার বা ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, আলাদা কোনো চার্জ আসবে কি না ফাইনাল বিলের সঙ্গে। কারণ ওরা খাবারের শেষে সার্ভিস চার্জ ও টিপস নিয়ে জোরাজুরি করে।
মিসরীয় শর্মা ও কুশারিটা অবশ্যই খাবেন। আমি ১২০ পাউন্ডের শর্মা খেয়েছি এক বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে, আবার এক ছোট গলির রেস্টুরেন্টে ৫০ পাউন্ডের শর্মাও খেয়েছি। সবসময় চেষ্টা করবেন, বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে না গিয়ে অলিগলির যেসব রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে খেতে।
সবচেয়ে সতর্ক থাকবেন মুদির দোকানে। যারা সৎ, তারা একটা কোক বা পেপসি ক্যান ১০-১২ পাউন্ডে নেবে। আবার অনেক জায়গায় একই জিনিস ৩০ পাউন্ড চাইবে, ১২ পাউন্ডের বেশি রাজি হবেন না। অবশ্যই সুগার ক্যান জুস, অর্থাৎ আখের রস খাবেন। প্রায় সব জায়গায় জুসের দোকান পাবেন। তবে, এখানেও চলে প্রতারণার চেষ্টা। আমি প্রথম যখন কিনি, তখন ৩০ দিতে হয়েছিল দাম না জানার কারণে। আমার কাছে এত ভালো লেগেছে যে, প্রতিদিন ৪-৫ গ্লাস করে খেতাম! পরে জানতে পারলাম, এটার দাম ১৫-২০ এর বেশি না।
এছাড়া, নানা ফ্লেভারের আইসক্রিম পাবেন মাত্র ২০-২৫ পাউন্ডে। অবশ্যই আইসক্রিম না খেয়ে মিসর থেকে আসবেন না। মোট কথা, যা ই কিনেন, যেখান থেকেই যে খাবার কিনেন, অবশ্যই দামাদামি করে কিনবেন।
দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘোরার সময় স্ক্যাম থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকবেন। ছবি : সংগৃহীত
দর্শনীয় জায়গাগুলোর আশেপাশে স্ক্যাম
কায়রোতে আমি যতগুলো বিখ্যাত জায়গা ভিজিট করেছি, তার বেশিরভাগ জায়গায় টিকিট কেটে ঢুকতে হয় এবং বিকেল ৪টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই সময় হিসাব করে যাবেন। বেশিরভাগ জায়গাতেই টিকিটের জন্য ক্যাশ টাকা গ্রহণ করে না, শুধু কার্ড পেমেন্ট নেয়। তাই ক্রেডিট কার্ড সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। অনেক জায়গায় ডেবিট কার্ড প্রত্যাখান করে, কিন্তু ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সহজেই পেমেন্ট করা যায়। কার্ড না থাকলে আশেপাশে অনেক ব্রোকার পাবেন, যারা পেমেন্ট সিস্টেম সেল করে। ওদের কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করে টিকিট কিনে দেবে। তার জন্য একটা চার্জ নেবে। সেখানেও ভালোভাবে দামাদামি করে নেবেন।
কোথাও ঘোড়ার গাড়ি, বিশেষ করে ক্যামেল রাইড নেওয়ার আগে ভালো করে বোঝাপড়া করে নেবেন- কতটুকু সময়ের জন্য কত পাউন্ড। সবচেয়ে বেশি স্ক্যাম এখানেই করে- এক ঘণ্টার রাইডের কথা বলে ২০-৩০ মিনিট পরেই বলবে সময় শেষ! এক্ষেত্রে আপনি রাইডে ওঠার আগে ঘড়ির টাইম দেখে বলে দেবেন, ‘টাইমটা এখন শুরু হলো ও এই সময়ে শেষ হবে, এর আগে হলে আমি টাকা পরিশোধ করব না।’
রাস্তাঘাটে মানুষের স্ক্যাম থেকে কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন?
আপনি কায়রো শহরে হাঁটাচলা করে ঘুরছেন, দেখবেন হঠাৎ মুখ ঢাকা বোরকা পরা নারী এসে হাত পাতবে অথবা কোনো আইটেম আপনার কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করবে ও ক্যাশ টাকা চাইবে। এড়াতে চাইলেও তারা আপনার পেছনে পেছনে আসবে। সম্ভব হলে এদেরকে ৫ পাউন্ড করে দিয়ে দেবেন। দেখবেন, বিদায় হয়ে গেছে। ভুল করেও এদের কাছ থেকে কিছু কিনবেন না।
ট্যাক্সিতে কোথাও গেলেন, আপনি যদি ভাড়া ৫০-৬০ পাউন্ড ঠিক করেন; যখন পেমেন্ট করতে যাবেন ক্যাশ, তখন বলে উঠবে-‘আমি তো ব্রিটিশ পাউন্ডের কথা বলছি, আমাকে ব্রিটিশ পাউন্ড দাও!’ নানা ঝামেলা শুরু হবে। তাই ট্যাক্সিতে ওঠার আগেই বোঝাপড়া করে নেবেন, ভাড়া ইজিপ্সিয়ান নাকি ব্রিটিশ পাউন্ডে।
আবার আপনি হাঁটছেন, হঠাৎ দেখলেন কিছু কম বয়সী ছেলে বিশাল বড় লম্বা লেন্সের ডিএসএলআর নিয়ে আপনার সামনে হাজির। আপনার অজান্তেই আপনার একটা ছবি তুলে আপনাকে দেখাবে ও হাই প্রাইস চাইবে। সেইসঙ্গে বলবে, ‘আরও তুলে দেই।’ ওদের এড়িয়ে গেলেই ভালো, বলবেন কিছুই লাগবে না। ফটোশুট করতে গেলেও অবশ্যই দামাদামি করে নেবেন, যা দাম চাইবে তার অর্ধেক বলবেন।
এছাড়া কিছু বৃদ্ধ অথবা তরুণ মানুষ এসে আগে কথা বলতে চাইবে, আপনার অনেক সুনাম করবে। তারপর হঠাৎ পকেট থেকে কোনো পণ্য বের করবে অথবা কার্ড দেখিয়ে বলবে- সে সার্টিফাইড ট্যুর গাইড, তাকে হায়ার করতে অথবা তার কাছ থেকে পণ্য কিনতে। আবার কেউ বলবে, সামনেই তার দোকান, সেখানে কিছু এক্সক্লুসিভ জিনিস বিক্রি করে। এই বলে তার দোকানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আপনি এদেরকে একদম এড়িয়ে যাবেন! বেশিরভাগ স্ক্যামার এরাই।
বৃদ্ধ মানুষ, ছোট বাচ্চারাও এসে আপনার কাছে কোনো কারণ ছাড়াই টাকা চাইবে। বলবে তার স্ত্রী হাসপাতালে, কিছু সাহায্য করতে। এরাও স্ক্যামার। এদেরকেও এড়িয়ে যাবেন এবং কোনো কিছু ফ্রিতে দিতে চাইলেও এদের কাছ থেকে না নেওয়াই ভালো।
মিসরের প্রাচীন বাজার ‘খান আল-খলিলি’। ছবি : সংগৃহীত
কম দামে ভালো জিনিস কোথায় পাবেন?
যদি শপিং করতে হয়, তাহলে আমি বলব খান আল খালিলি মার্কেট, যেটা পৃথিবীর অসাধারণ একটি ট্রেডিশনাল মার্কেট হিসেবে পরিচিত। ওই এলাকার আশেপাশে নানা ধরনের দোকান পাবেন, এমনকি ওই এলাকার স্ট্রিটেও অনেক দোকান পাবেন, যাকে আমরা ফুটপাত মার্কেট বলি। সেখানে ভালো ভালো ব্র্যান্ডের ট্রলি, কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে হ্যান্ডিক্রাফট, অ্যারাবিক ট্রেডিশনাল জিনিসপত্রসহ অনেক জিনিস সস্তায় পাবেন। তবুও দামাদামি করে কিনবেন, নয়ত প্রতারিত হতে পারেন।