দক্ষিণ এশিয়ায় রাজপথের পর কী?

ড. মো. আবু হাসান

মতামত

২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি পরিচিতি পায়।

2026-10-14T06:09:46+00:00
2026-10-14T06:09:46+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
দক্ষিণ এশিয়ায় রাজপথের পর কী?
ড. মো. আবু হাসান
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি পরিচিতি পায়। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, তার সমালোচনার লক্ষ্য সব বেকার তরুণ ছিলেন না; ভুয়া সনদধারীদের প্রসঙ্গে তিনি ‘তেলাপোকা’ আর ‘পরজীবী’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। এর আগেই অপমানসূচক পরিচয়টিকে ব্যঙ্গ আর প্রতিবাদের প্রতীকে বদলে ফেলেন তরুণ আন্দোলনকারীরা। 

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনেও এমন একটি মোড় এসেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের বাচ্চা’ মন্তব্যের প্রতিবাদে রাতে ঢাকার রাজপথে তরুণরা স্লোগান তোলেন, ‘আমি কে, তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ যে পরিচয় দিয়ে আন্দোলনকারীদের হেয় করা হয়েছিল, সেটিই পাল্টা রাজনৈতিক ভাষায় রূপ নেয় প্রতিবাদের মুখে। ক্ষমতাবানদের অবজ্ঞার ভাষা কখনো আক্রান্ত মানুষের হাতে প্রতিবাদের অস্ত্র হয়ে ওঠে। 

ককরোচ আন্দোলনের সামনে এই পরীক্ষার প্রথম বড় সুযোগ আসে জুলাইয়ে। ভারতের ২০২৬ সালের চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস আর অনিয়মের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়। কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদ, অনশন আর রাজনৈতিক চাপের পর ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী সরে দাঁড়ান। এটি আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য। ব্যঙ্গাত্মক পরিচয় নিয়ে শুরু হওয়া একটি তরুণ আন্দোলন সংগঠিত চাপ তৈরি করে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে নেয়। কিন্তু একজন মন্ত্রীর বিদায় মানেই পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রশ্ন ফাঁসের বিচার, পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা আর ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা না হলে এই জয়ও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

অক্টোবরে তরুণরা আবার রাজপথে ফেরেন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রশ্ন নিয়ে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার খবর আসে। নির্বাচন কমিশন বলছে, এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত আর খুঁজে না পাওয়া মানুষ রয়েছেন। বিরোধী দল আর আন্দোলনকারীদের অভিযোগ— এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারও বাদ পড়ছেন। ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর বিক্ষোভে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আর অভিনেতা প্রকাশ রাজ অংশ নেন। স্লোগানে রাজনৈতিক অভিযোগের সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মক ভাষাও মিশে যায়। ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ ঠেকাতে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসে, মেট্রো চলাচলে বাধা আসে, ইন্টারনেট পরিষেবাও সীমিত হয়। তবে রাতে ধ্রুব রাঠি এবং পরদিন আন্দোলনের তিন নেতা মুক্তি পান। পরদিনও আটক অব্যাহত থাকে।

নেপালে ২০২৫ সালে তরুণদের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ আর প্রাণহানির পর সরকার পড়ে যায়। পরের নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ২৭৫ আসনের সংসদে ১৮২টি আসন পায়। তবে নতুন নেতৃত্ব এলেই পুরোনো ক্ষমতাচর্চা দূর হয় না। নেপালের শ্রমমন্ত্রী দীপক কুমার শাহকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল— তিনি নিজের পদ ব্যবহার করে স্ত্রীকে স্বাস্থ্যবীমা বোর্ডের সদস্যপদে বহাল রাখার চেষ্টা করেছেন। এটি একদিকে জবাবদিহির দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে মনে করিয়ে দেয়— পুরোনো ক্ষমতাচর্চার ঝুঁকি তরুণদের মধ্যেও থেকে যায়। বাংলাদেশেও আন্দোলনের কয়েকজন সংগঠক অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেন। পরে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। শিক্ষাটি স্পষ্ট : আন্দোলনের নৈতিক শক্তি সরকার পরিচালনার সক্ষমতা বা কাঠামোগত সংস্কারের নিশ্চয়তা দেয় না।

ভারতের অভিজ্ঞতা আরেকটি কঠিন প্রশ্ন তোলে। বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য আর সম্পদের কেন্দ্রীভবন নিয়ে অসন্তোষ থাকার পরও বিজেপি কীভাবে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখে? ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, কল্যাণমূলক কর্মসূচি, শক্তিশালী দলীয় সংগঠন, জাতীয় নিরাপত্তার বয়ান, মোদির ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবমূর্তি আর বিরোধীদের দুর্বলতা মিলে বিজেপির ভিত তৈরি হয়েছে। 

ফ্রিডম হাউসের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে সাংবাদিক, নাগরিক সংগঠন ও সরকারের সমালোচকদের ওপর চাপ এবং মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য বাড়ার উদ্বেগ উঠে এসেছে। এই বৈষম্য শুধু নির্বাচনি বয়ানে আটকে নেই, রোজকার জীবনেও প্রকাশ পায়। কলকাতার চিৎপুরের জ্যোতিনগর কলোনিতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে পাঁচটি সরকারি পানির কল বন্ধ। ফলে প্রায় পাঁচ হাজার বাসিন্দা নিয়মিত পানির সংকটে পড়েছেন। এলাকার বেশিরভাগ বাসিন্দা মুসলিম। অল্ট নিউজের ১২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, পানি বন্ধ রেখে তাদের উচ্ছেদের চাপ তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘পানির কারবালা’। মৌলিক নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ, বিশেষত যখন তা ধর্মীয় পরিচয় আর উচ্ছেদের আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন নাগরিক সমতার প্রশ্ন তুলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের হাসিনা আমলের সঙ্গে তুলনা আসতেই পারে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, বিরোধীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রভাব এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নে মিল আছে। তবে নির্বাচনি প্রতিযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় পার্থক্যও স্পষ্ট। এখানেই গ্রামসির আধিপত্যের ধারণা কাজে লাগে। ক্ষমতাসীনরা যখন নিজেদের স্বার্থকে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এবং মানুষের সাধারণ বোধ ও সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারেন, তখনই তাদের নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্যতা পায়। সম্মতি দুর্বল হলে প্রশাসনিক বাধা, নজরদারি আর বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। আধুনিক রাষ্ট্রে সম্মতি ও জবরদস্তি পাশাপাশি চলে। আসল প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কতটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারছে এবং বিরোধিতার মুখে কেমন সাড়া দিচ্ছে (গ্রামসি, ১৯৭১)। ওয়েবারের (১৯৭৮) বৈধ কর্তৃত্বের ধারণাও মনে করিয়ে দেয়, আইনগতভাবে ক্ষমতা থাকা আর নাগরিকের চোখে সেই ক্ষমতাকে ন্যায্য মনে হওয়া এক কথা নয়।


শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণপ্রতিরোধ দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট শাসকের প্রতি সম্মতি কত দ্রুত ভেঙে দিতে পারে। জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে রাজাপাকসের পরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে ওঠে। পরবর্তী নির্বাচনে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার জোটের জয় পুরোনো রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি সমর্থনে বড় ভাঙন দেখায়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের মূল্যায়নে দেখা যায়, দেশটির অর্থনীতি সংকট পূর্ব উৎপাদনের স্তরে ফিরলেও ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল। পুনরুদ্ধারের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

রাজপথে জয় মানে ক্ষমতার দরজা খুলে যাওয়া। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে ক্ষমতার নিয়ম বদলানো আলাদা লড়াই। সরকার বদলানো সম্ভব, কিন্তু প্রতিষ্ঠান, স্বার্থ ও ক্ষমতার সম্পর্ক না বদলালে পুরোনো অভ্যাস নতুন চেহারায় ফিরে আসে। যে রাষ্ট্র নাগরিকের কণ্ঠকে ভয় পায়, তাকে নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর যে রাষ্ট্র নাগরিকের সমালোচনাকে নিজের ভুল শোধরানোর সুযোগ হিসেবে নেয়, সে সম্মতির ভিত গড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের সামনে তাই প্রশ্ন— নতুন নেতৃত্ব মানুষের হারানো সময়, নষ্ট সুযোগ আর ভেঙে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে কি না। আজ যারা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, কাল ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে দেবেন কি?

সহযোগী অধ্যাপক, শহিদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
মতামত লেখকের নিজস্ব 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   দক্ষিণ এশিয়া  রাজপথ  মতামত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: