বাংলাদেশে প্রতি বছর কতটি গাছ কাটা হয়, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণা অনুযায়ী, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাঁধ তৈরির কাজে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নেই বছরে সাড়ে ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখের বেশি গাছ কাটা হয়। কাগজ তৈরির জন্য গাছ কাটার বিষয়টি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই আলোচিত। কাগজের প্রধান কাঁচামাল উদ্ভিজ্জ সেলুলোজ, যা সাধারণত কাঠ ও বাঁশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশে কাগজ ও মণ্ডশিল্পে কাঠ, বাঁশ ও মিশ্র কাঠ ব্যবহার করা হয়। দেশের প্রথম কাগজকল কর্ণফুলী পেপার মিলসের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে বাঁশ ও স্থানীয় কাঠ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
দেশের কাগজ ও কাগজের বোর্ড উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকেও বাঁশ ও গাছ কাটা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর কাগজ উৎপাদনের জন্য বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হয়। বিশ্বে উৎপাদিত কাঠের উল্লেখযোগ্য অংশ কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। একটি হিসাব অনুযায়ী, এক টন কাগজ তৈরিতে ১৭ থেকে ২৪টি পূর্ণবয়স্ক গাছের সমপরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বাণিজ্যিক কাঠ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাগজশিল্পে ব্যবহৃত হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৬০ কোটির বেশি মানুষ জীবিকার জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। বন অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ, বায়ুর মান উন্নয়ন ও ভূমিক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বন মানুষের খাদ্য, ওষুধ, মধু, মাশরুম, ফল ও বাদামের উৎস। বনভিত্তিক জীবিকা ও শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়। পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বনে বসবাস করে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আদিবাসী। এসব মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি বনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। গাছপালা শব্দদূষণ কমাতেও সাহায্য করে। বাড়ির আশপাশে গাছপালা থাকলে শব্দের তীব্রতা কমতে পারে। ফলে বন ধ্বংসের প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপর পড়ে না, মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে পাহাড়ি বন, ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় বন, শালবন ও সামাজিক বনায়নসহ বিভিন্ন ধরনের বন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি বন দেখা যায়। সুন্দরবন দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। খুলনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় উপকূলীয় বনায়ন গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে টাঙ্গাইল, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শালবন রয়েছে। পাহাড়ি বনে তেলশুর, চিকরাশি, বৈলাম, গামার ও বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ জন্মে। এসব বনে বানর, বুনো শূকর, বনমুরগি, সাপ, শিয়াল ও কাঠবিড়ালিসহ নানা বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। মধুপুর গড় দেশের উল্লেখযোগ্য শালবন। সুন্দরবনে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, বাইন, ধুন্দুল ও কেওড়ার মতো গাছ জন্মে। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ বহু বন্যপ্রাণীর বসবাস। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রেলপথ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সামাজিক বনায়ন করা হয়। এসব বন ও বৃক্ষরাজি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু দখল, অবৈধ স্থাপনা, চাষাবাদ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বনভূমি ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ দশমিক ৮৪ একর বনভূমি বেদখল হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ একর সংরক্ষিত বন। বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত ৮৮ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে শনাক্ত করার তথ্যও উঠে এসেছে। এসব জমিতে শিল্প-কারখানা, রিসোর্ট ও বসতবাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি কৃষিকাজ করা হচ্ছে। অন্য একটি হিসাবে বনভূমি দখলের সঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বেদখল হওয়া বনভূমির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বনও বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। বনভূমি দখল বন্ধ করতে হলে শুধু দখলদার শনাক্ত করলেই হবে না; অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বন ধ্বংসের আরেকটি বড় পরিণতি জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল বন। বন উজাড় হলে প্রাণীরা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হারায়। ফলে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের বিভিন্ন মূল্যায়নে বাংলাদেশের বহু বন্যপ্রাণী প্রজাতির বিপন্ন অবস্থার কথা উঠে এসেছে। হাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বনরুই, উল্লুক ও বিভিন্ন প্রজাতির হরিণসহ অনেক প্রাণী নানা ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে। বনভূমি কমে যাওয়া, আবাসস্থল বিচ্ছিন্ন হওয়া, শিকার এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বন রক্ষা করা তাই কেবল গাছ সংরক্ষণের বিষয় নয়; জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখারও অপরিহার্য শর্ত।
এ অবস্থায় কাগজের ব্যবহার কমানো এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। কাগজশিল্পে পুনর্ব্যবহৃত কাগজ, আমদানি করা কাগজের মণ্ড এবং আখের ছোবড়ার মতো কৃষিজাত উপাদান ব্যবহার করা হলে কাঠের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে কাঁচামালের উৎস, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার জন্য কাগজের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল পরীক্ষা চালু হয়েছে। এস্তোনিয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত। ফিনল্যান্ডে জাতীয় ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার প্রচলন রয়েছে।
চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও ডিজিটাল পরীক্ষার ব্যবহার বাড়ছে।
বাংলাদেশেও শিক্ষাক্ষেত্রে কাগজবিহীন পরীক্ষা চালুর সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেপারলেস পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলেও এ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত কম্পিউটার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ, নিরাপদ পরীক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা। প্রযুক্তিসুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
কাগজবিহীন পরীক্ষা চালু করলেই বন উজাড় বন্ধ হবে না। তবে কাগজের চাহিদা কমানো, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং বনভূমি দখল বন্ধ করার সমন্বিত উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পরীক্ষার প্রসার সেই উদ্যোগের একটি কার্যকর অংশ হতে পারে। বন রক্ষায় রাষ্ট্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে হলে কাগজের ব্যবহার কোথায় কমানো সম্ভব, তা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
পরিবেশবিষয়ক লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি